
জাদুকরের মৃত্যু
আমার ছিল বাউল হওয়ার শখ,
আমার ছিল জাদু শেখার কথা,
আমার ছিল ঘুমিয়ে পড়ার মন,
নীল আকাশে জড়িয়ে নকশী কাঁথা
স্বপ্ন জিনিসটা খুব বাজে ! আপনি ঘুমুচ্ছেন। অসহায় অবস্থা। কিছু করার ক্ষমতা নেই, এমনি সময় এক বিকটাকৃতি মুখ এসে দেখা দিল। আপনি না পারবেন পালাতে। না পারবেন মারতে। শ্যামলবাবু ঘুম থেকে উঠেই কথাগুলো ভাবলেন। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে তিনি একটা স্বপ্ন দেখেছেন। দেখেছেন কি, একটা মুশকো বিড়াল তাঁর ঘরে এসে তাঁর টেবিলের উপর তাঁরই জন্য রাখা দুধ খেয়ে নিচ্ছে। অথচ পাশে শুয়ে থেকেও সবকিছু দেখেও শ্যামলবাবু কিচ্ছুটি করতে পারছেন না। আশ্চর্য ব্যাপার, বিড়ালটা দুধে একটা মাত্র চুমুক দিয়ে ঢাকনাটা ঠিক সেই জায়গায় রেখে তাঁর দিকে একটা ভ্রুকুটি করে চলে গেল। ঠিক তখনই ঘুম ভাঙল তাঁর। বিড়ালটা নেই। চোখটা তাঁর টেবিলের উপরে রাখা দুধের বাটিটার দিকে গেল। ঢাকাটা তেমনিই দেওয়া আছে। কিন্তু স্বপ্নটা এত বাস্তব যে সেটাকে অগ্রাহ্যও ঠিক করা যাচ্ছে না। ঢাকনাটা সরাতেই তাঁর মনে হল, দুধটা একটু কম বলেই বোধ হচ্ছে।
শ্যামল বাবু আস্তে আস্তে দুধের বাটিটা তুলে নিয়ে জানালা দিয়ে দুধটা বাইরে ফেলে দিলেন। ফেলে দিয়ে ফিরে আসছেন, এমন সময় হঠাৎ একটা জিনিস দেখে খুব অবাক হয়ে গেলেন। একটা বিড়াল পাঁচিল টপকে পাশের রমেনবাবুর বাড়িতে ঢুকে পড়ল। ঘটনাটা অকছার ঘটে। কিন্তু অবাক হবার মতো ব্যাপার হল: বিড়ালটা ঠিক যেন তাঁর স্বপ্নে দেখা বিড়ালটার মতো দেখতে।
অনেকক্ষণ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলেন শ্যামলবাবু। বিড়ালটা রমেনবাবুদের পোষা। রমেনবাবু লোকটাকে খুব একটা ভালো লাগে না তাঁর। দুজনেই এ পাড়ায় নতুন। অথচ লোকটার তাঁর সাথে আলাপ করার ইচ্ছাই নেই! একি কম অন্যায়! শ্যামলবাবুও যান না নিজে থেকে। কী দরকার! চাকুরি থেকে রিটায়ার করেছেন বছর কয়েক হল। হাতে তাই কাজ কিছু নেই বললেই চলে। আর সেজন্যই ভাত খাওয়ার পরই একটু গড়িয়ে নেওয়া অভ্যেস হয়ে গেছে। আজও সেই ভাত ঘুমের সময়েই বিড়ালটা এসে কুকর্মটা করে গেল।
যাই হোক, শ্যামলবাবু তখন ব্যাপারটা অতটা গুরুত্ব দিলেন না। কিন্তু পর পর দুদিনে যা ঘটনা ঘটল, তাতে গুরুত্ব দিতেই হল। পরপর দুদিনেই বিড়ালটা এল। এই দুদিনে বিড়ালটা দুধের বাটির দিকে ফিরেও তাকাল না।
প্রথমদিন টেবিলের ড্রয়ারে রাখা একটা সিল্কের রুমাল নিয়ে গেল। সেটা অবশ্য শ্যামলবাবু ব্যবহার করতেন না। কিন্তু জিনিসটা নতুনই ছিল। পরের দিন একটা নতুন পার্কার পেন টা বিড়ালটা তাঁর নাকের ডগা দিয়ে নিয়ে চলে গেল। কিন্তু স্বপ্নে তিনি কিছুই করতে পারলেন না। একেবারের চকচকে নতুন ছিল জিনিসটা। ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য রেখে দিয়েছিলেন ওটা।
শ্যামলবাবু ব্যাপারটা বেশ গুরুত্ব দিয়ে ভাবলেন। ব্যাপারটা কেবল স্বপ্ন নয়। জিনিসগুলো তিনি খুঁজেও পাচ্ছে না আর। স্ত্রী সুধাময়ীকে বলেননি অবশ্য। কি জানি শুনলে কি ভাববে আবার! একবার ভাবলেন, গিয়ে রমেনবাবুকে গিয়ে বলবেন, বেড়ালটা সাবধানে রাখতে। “বিড়ালটা আপনার পোষা, কিন্তু তা বলে অন্যের ক্ষতি করলে তো মেনে নেওয়া যায় না।” কিন্তু শ্যামলবাবু যেতে পারলেন না। যতই হোক, স্বপ্নে দেখা জিনিস, গিয়ে বলবেনটা কি? অন্যমনস্ক ভাবে দিনটা কেটে গেল। পরদিন দুপুরে শ্যামলবাবু ঘুমোবেন না ঠিক করলেন। কিন্তু ভাত খাওয়ার পরই তাঁর দুচোখের পাতা বুজে এল। বিড়ালটাকে আটকানোর জন্য তিনি জানালাটা ভেজিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়লেন।
তারপর তিনি যা দেখলেন তা ভয়ংকর। তিনি দেখলেন, পাশের বাড়ির রমেনবাবু পা টিপে টিপে জানালার নীচে এসে দাঁড়িয়েছেন। কোলে তাঁর পোষা বেড়াল। আস্তে আস্তে জানালাটা ফাঁক করে বেড়ালটাকে টুপ করে ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে দিলেন।
এতক্ষণ শ্যামলবাবু চুপচাপ শুয়েছিলেন। প্রচণ্ড চেষ্টা করছিলেন কিছু একটা করার। কিন্তু হাত পায়ের পেশীগুলোর কোনো সাড় ছিল না এতক্ষণ। রমেনবাবু অন্তর্হিত হবার পরই ধড়ফড় করে উঠে বসলেন শ্যামলবাবু। পাঞ্জাবীটা ভিজে গেছে ঘামে। নাড়ির গতি বেড়ে গেছে অনেকটা। পুরো চুরিটা ছবির মতো চোখে ভাসছে তাঁর। না, এ আর সহ্য করা যায় না। এর একটা হেস্তনেস্ত করা অবশ্যই প্রয়োজন। পাঞ্জাবিটা পাল্টে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন বাড়ি থেকে। রমেনবাবুর বাড়ির কাছে এসে হতাশ হতে হল তাঁকে। দরজায় তালা দেওয়া। শ্যামলবাবু বাড়ি ফিরে এলেন। ফিরলেই গিয়ে চার্জ করবেন বলে ঠিক করলেন।
রমেনবাবু পরদিন সকালে ফিরলেন। কিন্তু শ্যামলবাবুর চার্জ করা হল না। সকালেই তাঁকে ডাক্তারের কাছে রেগুলার চেক আপের জন্য যেতে হল। ফিরে এলেন প্রায় বারোটার সময়। ঠিক করলেন, বিকেলে একটা ব্যবস্থা করবেন।
ভাত খেয়ে যথারীতি শুয়ে পড়লেন। ঘুম সহজে আসছিল না। কিন্তু বহুদিনের অভ্যাস। আস্তে আস্তে ঘুমটা এসেই গেল।
আর রমেনবাবু যেন সেই অপেক্ষাতেই ছিলেন। ভেজানো দরজাটা খুলে তিনি স্বয়ং ঢুকে পড়লেন। তাঁর চোখে চকচকে লোভ শ্যামলবাবু স্পষ্ট দেখতে পেলেন। শ্যামলবাবুর দিকে একটা ভ্রুকুটি করে রমেনবাবু আলমারিটা খুললেন। আলমারির উপরেই তাঁর কতকালের প্রিয় হাতঘড়িটা রাখা ছিল। সেকালে বেশ দাম দিয়ে কেনা। সেটা আস্তে আস্তে বের করে নিয়ে আলমারিটা বন্ধ করে দিলেন আগের মতো। তারপর বিড়ালের মতো পা টিপে টিপে দরজার কাছে এসে শ্যামলবাবুর দিকে ফিরে একবার ফিচকে হেসেই অন্তর্হিত হলেন তিনি।
তক্ষুনি ঘুমটি ভাঙ্গল শ্যামলবাবুর। তাড়াতাড়ি তিনি দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন। নাঃ, কেউ নেই। ফিরে এসে আলমারি খুললেন। ঘড়ি নেই। আর সহ্য করা যায় না। বেরিয়েই যাচ্ছিলেন, হঠাৎ তাঁর মনে হল: এরকম ভয়ানক ডাকুর কাছে যাওয়ার আগে, অস্ত্র শস্ত্র কিছু একটা নেওয়া দরকার। আত্মরক্ষার জন্য কিছু অন্তত থাকা ভালো। টেবিলের উপর শশা ছোলার অস্ত্রটি ছিল। সেটাই পকেটে পুরে বেরিয়ে পড়লেন। রমেনবাবুর বাড়িতে এসে তিনি দু-দুবার বেল টিপলেন। কেউ খুলল না। শ্যামলবাবু দরজা ঠেল্লেন। আশ্চর্য দরজাটা খুলে গেল। একটু অবাক হয়েই ঘরের ভেতর পা বাড়ালেন।
আর পা বাড়াতেই একটা বন্দুকের নল তাঁর কানের নীচে এসে লাগল। “বাছাধন, এবার পালাবে কোথায়! প্রতিদিন এটা ওটা নিচ্ছে কিছু বলিনি, তাবলে এতবড়ো একোয়াগার্ডখানা নিয়ে চলে যাবে? হুঁ হুঁ বাবা, তক্কে তক্কে ছিলাম আজ, তা এখন কি নিতে এসেছিলেন স্যার?” শ্যামলবাবু আড়চোখে তাকালেন একবার। বন্দুক হাতে রমেনবাবু ভয়ংকর ভাবে তাকিয়ে আছেন। হাত পা তাঁর ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। পকেটের অস্ত্রের কথা ভুলেই গেছেন।
মনে মনে কোর্ট মার্শাল হবার কথা ভাবছিলেন। এমন সময় হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠল। রমেনবাবু বন্দুক নামিয়ে দরজার দিকে ফিরলেন। দরজা খোলাই ছিল।
একটি ছেলে ভিতরে এসে বললঃ “স্যার, অ্যাকোয়াগার্ডটা কাজ করছিল না বলে খুলে নিয়ে গিয়েছিলাম। আপনি ছিলেন না। ম্যাডাম জানেন। লাগিয়ে দিতে এসেছি।” রমেনবাবু হতভম্বের মতো ছেলেটাকে রান্নাঘরের দিকে হাত বাড়িয়ে যেতে বললেন। তারপর শ্যামলবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “অথচ আজ দুপুরে আপনাকে তো ওটা খুলে নিয়ে যেতে দেখলাম।”
শ্যামলবাবু একটু জোর ফিরে পেয়েছেন। “আপনি নিজের চোখে দেখেছেন?”
রমেনবাবু আমতা আমতা করে বললেন, “না, তা ঠিক নয়। স্বপ্নের মধ্যে দেখেছি বটে, কিন্তু ছবির মতো স্পষ্ট।” “থামুন! লজ্জা করে না? ভদ্রলোককে এরকম করে অপমান করতে?” রমেনবাবু শুকিয়ে গেছেন। যে ছেলেটি এসেছিল, সে “আসছি, স্যর” বলে বেরিয়ে গেল।
রমেনবাবু এবার জিজ্ঞাসা করলেন, “আচ্ছা বলুন তো, আপনি আমার বাড়ি কিজন্য এসেছিলেন?” “আমার ঘড়িটা ফেরত নিতে।” নিজের গলার জোরে শ্যামলবাবু নিজেই চমকে উঠলেন। রমেনবাবুর টেবিলে একটা টেবিল ক্লক নামানো আছে। সেদিকে তাকাতেই শ্যামলবাবুর বুকটা ধক করে উঠল। ঘড়িটা দেখে নয়। ঘড়ির নীচে লেখা “ঘড়িঘর” কথাটা দেখে। তাঁর মনে পড়ল, “ঠিকমতো টাইম দিচ্ছিল না বলে ঘড়িটা তিনি ঘড়িঘরে দিয়ে এসেছেন কিছুদিন আগেই।”
ওদিকে রমেনবাবু বলে চলেছেন, “ঘড়ি? কিসের ঘড়ি?” তাঁর গলাতেও জোর ফিরে এসেছে। হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ল শ্যামলবাবুর পকেট থেকে বার হওয়া অস্ত্রটির দিকে। চিৎকার করে উঠলেন, “ছুরি! ছুরি নিয়ে এসেছেন কেন মশাই?”
শ্যামলবাবু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। তারপর রমেনবাবুর হাত ধরে বললেন, “আমাদের মধ্যে ব্যাপারটা গোলমাল হয়ে গেছে রমেনবাবু।” তারপর নিজের কথা সব বললেন খুলে। এবং আশ্চর্য হয়ে শুনলেন রমেনবাবুও স্বপ্নে তাঁকে নানা জিনিস নিয়ে যেতে দেখেছেন। এও জানালেন রমেনবাবুর বন্দুকে কোনো গুলি ছিল না। রমেনবাবু বললেন, “আমার মিসেস বাড়িতে নেই। বসুন, একটু কফি করে আনি।”
জমিয়ে ঘণ্টা দুয়েক গল্প করে শ্যামল বাবু বাড়ি ফিরলেন।
নাহ্! রমেন বাবু লোকটাকে আর দাম্ভিক বলে মনে হল না তাঁর। বরং বেশ দিলখোলা বলা চলে।
ফিরে এসে শ্যামলবাবুর মনে পড়ল, পার্কার পেনটা তাঁর কোনো কালেই ছিল না। ওটা স্রেফ মনের ভুল। বাকি জিনিস গুলো অবশ্য সুধাময়ীদেবীই অন্য জায়গায় রেখেছিলেন।
সেদিন রাত্রে আরেকটা অদ্ভুদ ঘটনা ঘটল। শ্যামলবাবু আর রমেনবাবু দুজনেই একই সাথে একই স্বপ্ন দেখলেন। দেখলেন, “দুজনে বাগানের দোলনায় একসাথে বসে দোল খাচ্ছেন। শ্যামলবাবুর ঘড়ি পরে আছেন রমেনবাবু আর রমেনবাবুর অ্যাকোয়াগার্ড কোলে নিয়ে বসেছেন, শ্যামলবাবু।” পরদিন সকালে স্বপ্ন জিনিসটাকে শ্যামলবাবুর আর খারাপ লাগল না।
জিয়ন কাঠি, শারদীয়া ২০১৪ তে প্রকাশিত

আমার ছিল বাউল হওয়ার শখ,
আমার ছিল জাদু শেখার কথা,
আমার ছিল ঘুমিয়ে পড়ার মন,
নীল আকাশে জড়িয়ে নকশী কাঁথা

হেমন্তের শস্যহীন ন্যাড়া মাঠ অপেক্ষায় থাকবে | বৃষ্টি জলে ধুয়ে কবিতার বীজ বপন করবে নবীন কবির দল | মুক্তক ছন্দে ভরে উঠবে খামার |

অবসন্ন বেলায় ঈশ্বরীর বাগানে, গা এলিয়ে পড়ে ছিল কামরাঙা রোদ, পোড়ো বাড়িটার উঠোন থেকে, উঠে এসে উড়নচণ্ডী হাওয়া দূরান্বয়ী ছায়া দিয়ে

আমি বসে আছি নিস্তরঙ্গ কলরবকূলে, মালতীলতায় এবার ফুল আসেনি, হাঁড়িতে মা ভবানী, উনুনে পুড়ছে অস্তিত্বের ব্যাকুলতা