
জাদুকরের মৃত্যু
আমার ছিল বাউল হওয়ার শখ,
আমার ছিল জাদু শেখার কথা,
আমার ছিল ঘুমিয়ে পড়ার মন,
নীল আকাশে জড়িয়ে নকশী কাঁথা
পুরুত মশাইয়ের ভীষণ তাড়া। এমন সময় যজমানেরা তাকে চটিয়ে দিয়েছে। এত বড় একটা শ্রাদ্ধের পুজো, সেখানে কিনা পানই নেই। পইপই করে ফর্দ লেখার সময় ঠাকুর কেষ্টর ব্যাটদের কানে কামড়ে বলে দিয়েছিল এক গোছা পান না হলে চলবে না। বেটারা সে কথা কানেই দেয়নি। শ্রাদ্ধের আসরেই ঠাকুরমশাই বিড়বিড় করে উঠলেন, ‘শালা পানকিস্টের শ্রাদ্ধে পানেরই যোগান নেই’। কথাটা সত্য। আর বড় অপমানেরও। পান ব্যবসায়ী ছিল বটে কৃষ্ণ। পুরো নাম কৃষ্ণদাস বারুই হলেও এলাকায় তার ব্যবসার খাতিরে ‘পানকিষ্ণ’ নামেই তার পরিচিতি ছিল। সে কি আর আজকের কথা। নাই নাই করে আশিতে মরল বুড়ো। ও পাড়ার গদাই দাসের মা ই জানতো এই কৃষ্ণের কথা। কদিন আগে সেও চলে গেছে।
গদাই দাসের ন্যাড়া মাথায় এখনো চুল গজায় নি। অনেক কিছুই করতে পারত কৃষ্ণ বারুই।কিন্তু পান কে সে এত ভালোবেসে ফেলেছিল যে বর্ধমানের সিকিউরিটির চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে বরজ করার নেশায় দেশে ফিরে এসেছিল। সে অবশ্য আজকের কথা নয়, ঢের পুরনো। ভাবতে গেলে মনে হয় যেন গত জন্মের কথা। সবাই বলেছিল একেবারে মুখ্যু এই কৃষ্ণ টা। অত বড় চাকরি। খাওয়া-দাওয়া বাদে চারশো টাকা বেতন। সে সব ছেড়েছুড়ে কিনা এই গণ্ডগ্রামে পানের বরজ! তবে পাড়ার বুড়ো গুলো খুশি হয়ে বলেছিল, বংশের কাজটাকে ধরে রাখতে চাইছে তো রাখুক না। অত কোলাহলের কি দরকার। কৃষ্ণেরই বয়সি ও পাড়ার গণেশ সব শুনে বলেছিল,চলেই যখন এসেছিস তখন মানুষের লেগে কাজ কর। লাল পতাকা হাতে ধরে পার্টি অফিস চ। তখন লাল পতাকা দেখলে পুলিশ খেদাতো। কৃষ্ণ সে সাহস পায়নি। একরোখা কৃষ্ণ পানের বরজ করবেই। সেই উদ্দেশ্যেই খোঁজখবর করে সব জিনিসপত্র জোগাড় পাতি করে নিল।পুরন্দর নদীর ধারে কাঠা কতক জমি পড়ে আছে সেখানেই পানের বরজ হবে। এখানে অবশ্য এই প্রথম বরজ নয়। বহু লোকের বরজ আছে। সাধারণভাবে একাজ বারুজীবী দের হলেও চাষা, সদগোপ, তেলি, তামলি সবাই এই চাষে নেমেছে।
এই পানের চাষের প্রতিযোগিতায় কৃষ্ণের টিকে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। তবুও একরোখা কৃষ্ণকে দমানো যায়নি। ফি বছরই ঘাটাল থেকে পাগড়ি কিনে নিয়ে এলো। দূরপাল্লার বাসের ছাদে চাপিয়ে। বলাবাহুল্য দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে। বরজ করতে গেলে অনেক শুদ্ধতার দরকার। পান হল মা দুগ্গা। দেবতার মত যত্নআত্তি না করলে পান ফলানো যায় না। কত লোক শুধু বরজের অনিয়মের কারণে শাপগ্রস্ত হয়ে হেজে গেল তার ইয়ত্তা নেই। বাবু ভাইয়াদের সামনে বলে বরজের অনেক হ্যাপা, তাই ছেড়ে দিলাম। কিন্তু কৃষ্ণ জানে ওরা সব মায়ের কোপে পড়েছে। শুদ্ধাচার না রাখলে পান ফলানো যায় না। তাতে মা দুর্গা চটে যান। চায়ের দোকানে এসব কথা বললে লোকে হেসে উড়িয়ে দেয় কিন্তু কৃষ্ণ কিছু মনে করে না। স্থির অবিচল শিল্পীর মতো সে শুধু তার নিজের বরজের স্বপ্ন দেখে যায়। একদিন সে স্বপ্ন সত্যি হয়।দশ জন মানুষ নিয়ে তার দু কাঠা জমির এটেল মাটিতে বরজ বাঁধার কাজ শুরু করে। তখন ভূমিপূজার জন্য মাধবঠাকুরের বাবাকে ডেকেছিল কৃষ্ণ। নারকেল ফাটিয়ে ভূমি পুজো করে তবে বরজের কাজ শুরু করেছিল।
দেখতে দেখতে বরোজ বাঁধা হলো। প্রত্যেক দিন সকাল সন্ধা কাজের তদারকি করেছে সে। পাড়ার লোকেরা মুচকি মুচকি হেসেছে। কৃষ্ণ কিন্তু একমনে বরজ বেঁধেছে। বাসি জামা ছেড়ে, গামছা পরে, ছোট্ গুঁজে মা দুর্গার নাম স্মরণ করে বরজে ঢুকে কাজ করেছে। বরজের ভেতরে ঈশান কোনে মা দুর্গার ঘট পেতেছে। বরজের ত্রিসীমানায় কোন বদ লোকদের আনাগোনা সে পছন্দ করে নি। একাই সন্ধ্যেবেলা প্রদীপ জ্বেলে সন্ধ্যা দেখিয়ে দিয়ে যায় কৃষ্ণ। পানের চারা ধীরে ধীরে বাড়ে। বারুজীবী সম্প্রদায়ের লোক কৃষ্ণ। পানের যত্ন কিভাবে করতে হয় সে জানে। পাড়ার মাতব্বরেরা একদিন কৃষ্ণ কে ধরে। বলে এবার একটা বউ টউ নিয়ে আয়। একা আর কতদিক সামলাবি। গ্রামের মাতব্বররা আইবুড়ো লোকেদের দুঃখ-কষ্ট চিরকালই একটু বেশি বোঝে। কৃষ্ণের সে ব্যাপারে হুঁশ ফিরে এলে বাঁধাধরা করে একেবারে ‘ধরা বিয়ে’ হয়ে যায় গোবরডাঙ্গার অনিল বারুইয়ের চতুর্থ কন্যা হৈমবতীর সাথে। আহ্ যেমন নাম, তেমনি গুন! তবে কৃষ্ণ তার বউয়ের পিতৃদত্ত নাম পাল্টে ‘টগরি’ করে দিয়েছিল। হৈমবতী সে ডাকতে পারবে না। পান পরিচর্যার ব্যাপারে টগরি একেবারে সব্যসাচী। ওর বাবারও দু দুটো বরজ ছিল। গেল বছর বর্ষার জল ঝরে পড়ে যাওয়ার পর বরজ তুলে দিয়েছে। তাছাড়া ইদানিং আর লাভের মুখ দেখা যাচ্ছেনা। এসবের যা খরচ, তাতে ঢাকের দায়ে মনসা বিক্রির মতো ব্যাপার। তা অবশ্য ঠিক। পানের বাজার ধারেপাশে আর কই? সেই বিষ্ণুপুরে একটা বাজার বসে বটে। সপ্তাহে দুদিন। মঙ্গল আর শুক্রবার। তাছাড়া দু’একটি যা পানের গুমটি আছে। বিক্রিও কম। দামও কম। কিন্তু বরজের তো আর খরচ কম নয়। পাগড়ি দিয়ে ছাওয়া, গাছকে তুলে বেঁধে রাখা, লত নামানো, পিলি বাধা—এরকম হাজারো ঝক্কি। এতকিছু করার পর যদি পানের দাম না পাওয়া যায় তবে কে আর বরজ রাখবে ! সবাই তো আর কৃষ্ণের মতো এককাট্টা নয়।
তখনকার সময়ে পান বিক্রির ব্যাপারে সে একটা সহজ পন্থা ধরেছিল। তার তো সাইকেল নেই যে ভোর রাতে কটরার জঙ্গল পেরিয়ে বিষ্ণুপুরের বাজারে যাবে।সে পানের গোছ গুলোকে ভাল করে সাজিয়ে এক বিরাট মোট তৈরি করে ভোর ভোর হাঁটা লাগাতো তিন মাইল দূরে বাকাদহর হাটে। সপ্তাহে দু দিনের হাট। খুব জমে। ধাদিকা, ফুল বেড়ে, খড় কাটা, কুচিয়াকোল, চাঁচর গ্রামের সবার হাট একটাই। কী নেই সেখানে! ছিল না শুধু পান। কৃষ্ণের উপস্থিতিতে হাটের সে অভাবও পুরন হলো। জনপ্রিয়তা বাড়তে লাগল তার। তখন থেকেই সে পরিচিত হলো “পান কিষ্ণ” নামে। কুড়ি গোছ পান অনায়াসে বিক্রি হয়ে যায় একদিনের হাটে।একগোছে পান থাকা উচিত পঞ্চাশ টা কিন্তু দেওয়া হয় আটচল্লিশ টা। পান ব্যবসার এমনই নিয়ম। এক পোয়া চাইলে আবার তার অর্ধেক। আসলে ওই দু’চারটে পান মা দুর্গার নামে রেখে দিতে হয়।শরৎকালে দুর্গা পুজার সময় মা দুর্গার থানে সেগুলো দিয়ে আসতে হয়। সবাই অবশ্য দেয় না। সবাই তো আর কৃষ্ণের মতো সৎ নয়। হাটে এক দিনও কামাই হয় না পান কৃষ্ণের। রসিক কৃষ্ণের পানের রসে মজে থাকে বাকাদহ হাট।
সেই পানকিষ্ণের শ্রাদ্ধেই কি না পান নেই। এ তো রেগে যাওয়ারই কথা। কৃষ্ণের ছেলেরা ন্যাড়া মাথায় মাথা নিচু করে বসে আছে। শ্রাদ্ধের আসরে কে একজন টিপ্পনী কাটে, বুড়োটা এত পান বিক্রি করেছে আর নিজের শ্রাদ্ধের কাজে একটাও পান রাখেনি। আশ্চর্য!
আসলে বরজ থাকলে তবে তো পান। বরজ আর আছে নাকি ছাই। সে সব অনেক কাল আগে চুকেবুকে গেছে। কৃষ্ণের চার পুত্রেরই বরজ সম্পর্কে ছিল প্রবল অনীহা। বাবা বরজের কাজ করতে বললে গায়ে জ্বর আসতো। বারবার করে কৃষ্ণ বলেছিল,’অশুদ্ধ চিত্তে বরজ ঢুকবি নি’। আর সেটাই হয়েছিল একদিন। মেজ ছেলেটা লুঙ্গি পরে পান ভেঙেছিল একদিন। পরের বছর বরজ শুকিয়ে গেল। বৃষ্টিই ছিল না সে বছর। হাহাকার করে বুক চাপড়েও পানের বরজ আগলাতে পারেনি কৃষ্ণ। তারপর আর কি, পুরন্দরের পাড় আবার পুরন্দরই ফিরিয়ে নিল। এখন সেই জমিতে সবাই আলু লাগায়।
ভুটভুটি তে করে আলু ব্যবসায়ীরা আসে আর রাম শ্যাম টাকা তাদের হাতে গুঁজে দেয়। আর রাতারাতি ব্যবসায়ীদের পাকা দালান ওঠে। কোথায় পান, আর কোথায় পানির রসিক!
পুরুতের কথায় সম্বিত ফিরে কৃষ্ণের ছেলেদের। ‘পান আনতে যখন ভুলে গেছিস, ওই বেলগাছ থেকে দুটো পাতা ছিঁড়ে নিয়ে আয়। মন্ত্রের জোরে এগুলোকে পান বানিয়ে দেব। যা ছোট’।
‘পানকিষ্ণে’র শ্রদ্ধানুষ্ঠান পানের বদলে বেল পাতা দিয়েই সমাধা হয়ে যায় নির্বিঘ্নেই।

আমার ছিল বাউল হওয়ার শখ,
আমার ছিল জাদু শেখার কথা,
আমার ছিল ঘুমিয়ে পড়ার মন,
নীল আকাশে জড়িয়ে নকশী কাঁথা

হেমন্তের শস্যহীন ন্যাড়া মাঠ অপেক্ষায় থাকবে | বৃষ্টি জলে ধুয়ে কবিতার বীজ বপন করবে নবীন কবির দল | মুক্তক ছন্দে ভরে উঠবে খামার |

অবসন্ন বেলায় ঈশ্বরীর বাগানে, গা এলিয়ে পড়ে ছিল কামরাঙা রোদ, পোড়ো বাড়িটার উঠোন থেকে, উঠে এসে উড়নচণ্ডী হাওয়া দূরান্বয়ী ছায়া দিয়ে

আমি বসে আছি নিস্তরঙ্গ কলরবকূলে, মালতীলতায় এবার ফুল আসেনি, হাঁড়িতে মা ভবানী, উনুনে পুড়ছে অস্তিত্বের ব্যাকুলতা