
জাদুকরের মৃত্যু
আমার ছিল বাউল হওয়ার শখ,
আমার ছিল জাদু শেখার কথা,
আমার ছিল ঘুমিয়ে পড়ার মন,
নীল আকাশে জড়িয়ে নকশী কাঁথা
কোন সকালে যে এমন উদ্ভট শখ চেপেছিল ঘাড়ে, ভেবে রাগে আঙ্গুল কামড়ে ফেলেন অঘোর বাবু।
বেশ চলছিল দিন। সকালে চা, বিকালে পাপড়ের সাথে আবার চা। দুপুরে ভাত, রাত্রে রুটি। এই নিয়ে জীবন মন্দ ছিল না। কিন্তু ওই মাথার পোকা নড়ে উঠতেই কেলো হল। ছন্দের মিল হলেই কবিতা যে হয় না, সাথে ভাব বস্তুর মিলন চাই, এই বোধ জাগ্রত হল ধীরে ধীরে।
ধীরে ধীরে বুঝলেন, সাহিত্যের ফর্ম গুলির ব্যবহার প্রয়োজন অনুসারে করতে হয়। অর্থাৎ , কবিতার ব্যাবহার করতে হবে কোথায়, কোথায় বা উপন্যাস নামাবেন, কোথায় নাটক চলবে, কোথায় ছোটগল্প, আবার কোনখানে প্রবন্ধ না লিখে উপায় নেই, সেই সব প্যাঁচ পয়জার তাঁর জানা হয়ে গেল একে একে। দু এক খানা গল্প ছাপাও হয়ে গেল। এক খানা উপন্যাসও নামিয়ে ফেললেন । যখন ভাবছেন, এবার কীভাবে কোনও প্রকাশক কে ধরে সেটিকে মলাট বন্দী করানো যায়, সেই সময় বিনামেঘে বজ্রপাত গুলি শুরু হল।
অঘোর বাবু অনেক গুলি আধুনিক কবিতা লেখার পর হঠাৎ ভাবলেন , শিশু সাহিত্যের বেহাল দশা কিছু ঘোচানো প্রয়োজন। প্রাচীন গদ্য সাহিত্যের প্রতি শ্রদ্ধা বশত তিনি ফের বিদ্যাসাগরে হাত দিলেন। বর্ণ পরিচয়ের এক খান গল্প তাঁর মনে ধরল। সেই যেখানে ভুবন নামের এক অবোধ তস্কর নানান জায়গায় চুরি করে মাসির কাছে জমা রাখে। মাসিও মহা খুশি হয়ে তাকে বাহবা দেয়। অঘোর বাবু ঠিক করলেন এই গল্পটির এক নাট্য রূপ তিনি পেশ করবেন। শেষে কান ছেঁড়ার বিভৎসতা টুকু বাদ দেবেন শুধু।
সেই মত লেখাও সারা হল। এবার পাবলিক অপিনিয়ন এর জন্যই ফেসবুক এ পোস্ট দিলেন ।
সেই সর্বনাশের শুরু। সন্ধ্যে বেলায় ভোলা সদলবলে হাজির। এক খানা সবুজ গেঞ্জি গায়ে।
” মাস্টার মশাই , এটা কী?”
বলে সে পোস্ট দেখায়।
অঘোর বাবু চিন্তিত হন। লেখাটি যে বিদ্যাসাগরের গল্প থেকে অনুপ্রাণিত, সেটি পোস্টে লেখা নেই। ভোলা কি ধরতে পেরে ভর সন্ধ্যে বেলা দল বল নিয়ে চলে এল!
কিন্তু ভোলার লাল চোখে তো বিদ্যাসাগরের প্রতি শ্রদ্ধা ধরা পড়ছে না।
তবুও মিন মিন করেই বললেন, ” এটা একটু ভুল হয়ে গেছে ভাই! বিদ্যাসাগরের নামটা এডিট করে জুড়ে দিচ্ছি। এত রাগ করার কিছু নেই। এই তোমার সামনেই জুড়ে দিচ্ছি।”
” আরে ধুর মশাই! বিদ্যাসাগরের কথা বলছি না মোটেই! এই দেখুন! এটা কেন??”
অঘোর বাবু চোখ সরু করে দেখলেন।
হ্যাঁ, এটাও একটু বাড়াবাড়ি হয়েছে বটে। নিজের একটু স্বকীয়তা বজায় রাখতে গিয়ে মাসির জায়গায় পিসি বসিয়েছেন। বাকি তো সব একই রেখেছেন। সেই চুরির মাল যথানিয়মে ভাইপো ভুবন পিসিকে দেয়। পিসি তাঁকে বড় ভালোবাসেন, সবসময় আঁচলের আড়ালে রাখেন, আর আস্কারা দেন। এ তো বিদ্যাসাগর মশায় লিখে গেছেন কত যুগ আগেই। শুধু মাসির জায়গায় পিসি বসাতেই এত ঝামেলা।
ভোলার আবার ধৈর্য কম।
সে ফের বলে ওঠে, ” কেন এসব লিখতে যান কে জানে! চুরি , পিসি, ভাইপো, .. এসব ছাড়া কি আর সাহিত্য হয় না নাকি! ও পাড়ার বুদ্ধিজীবী সরকার বাবুকে দেখুন দেখি! কোনও সাতে পাঁচে না থেকে দর্শন চর্চা করেন। হেবি লেখেন। নিজেকে জানা, মায়াবি জগৎ ফগত নিয়ে লেখা। তা না করে.. আপনি রাজনীতি নিয়ে পড়েছেন সার!
যাই হোক, পুরনো কোনও কিছু থাকলে বার করুন । ভেঙে টেঙ্গে চলে যাই। তবুও আপনি সার বলে এমন ভাবে বলছি.. তাছাড়া কী আর অপশন পেতেন নাকি! “
আঘরবাবু এখনও অন্ধকারে। লোকের লেখা চুরি করা যে এত অপরাধ হয়ে যাবে, তা স্বপ্নেও ভাবেন নি। তিনি বোঝানোর চেষ্টা করার আগেই ভোলা পুরনো টিভি আলমারির মাথা থেকে পেড়ে খন্ড বিখণ্ড করে ফেলেছে।
অঘোর বাবু কী করেন! নিজের দোষ না জেনেই নিজেকে তাঁর খুব অপরাধী মনে হচ্ছে । এই সব সামাজিক কাজ নিয়ে আর গল্প নয়। টিভি ভাঙুক আর যাই করুক, যেতে যেতে একটি দামি কথা বলে গেছে ভোলা।
সে সান্ত্বনার সুরে বলেছে, ” কিছু মনে করবেন না সার! এসব ভাঙ চুর করে দিন চালাই। আপনি সার, এলাইনে থাকবেন না। আপনি ঠাকুর দেবতা, ধর্ম গ্রন্থ, রামায়ণ এসব নিয়ে থাকুন। রাজনীতি টাজনীতি এসব আপনার এরিয়া নয়!”
তারপর বেশ কয়েকদিন অঘোর বাবু রামায়ন পড়ছিলেন। কিন্তু আবার সেই পোকা নড়ে উঠল। রামায়ণে সীতার অগ্নি পরীক্ষার অধ্যায়ই তাঁর টনক নড়ে উঠল। আর নড়ে উঠল তাঁর সেই পোকাটি। তিনি সীতার পক্ষ নিয়ে এক চাছা ছোলা গল্প নামিয়ে দিলেন। তিনি বললেন, সীতাকে যখন রাবণ অপহরণ করে নিয়ে যায়, তখনই রামের প্রথম কর্তব্য চ্যুতি হয়। সেই রাম ই আবার সীতা উদ্ধারের পর অগ্নি পরীক্ষার বিধান দেন। এ চরম অন্যায়। এই অন্যায়ের বদলা অঘোর বাবু তাঁর গল্পে নিলেন। তিনি সীতাকে দিয়ে রামের অগ্নি পরীক্ষার ব্যবস্থা করলেন। রাম বেঁকে বসলেন। তারপর এক তুমুল বাক বিতন্ডার সৃষ্টি করলেন অঘোর বাবু। যুক্তি পাল্টা যুক্তির জাল ধুম্রজাল সৃষ্টি করে ফেলল।
এবার আর ফেসবুক নয়, এক পত্রিকাতে ছাপিয়ে দিলেন গল্পখানা।
দিন কয়েক পরে, ফের ভোলা হাজির।
এবার তার বেশ বদলেছে। গায়ে তার কমলা গেঞ্জি, মাথায় গেরুয়া ফেটি। চোখ গুলি শুধু একই রকম লাল।
ভোলা বেছে বেছে পুরনো একটি রেডিও পেয়ে গেছে। সেটিকেই বিভিন্ন ভাবে ভাঙার চেষ্টা ভাবনা চালাচ্ছে।
ভোলার সাথে আর একটি পাতলা ছেলে এসেছে। সে অঘোর বাবুর দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বলল, ” হিন্দুদের ঠাকুর বলে পার পেয়ে যাচ্ছেন। পারেন তো আল্লাহ কে দু চার কথা লিখুন তো দেখি কত দম। “
অঘোর বাবুর গলা শুকিয়ে কাঠ। কাউকে দেখিয়ে দিতে কিছু লেখা অঘোর বাবুর সাধ্যের বাইরে। তিনি তো প্রতিবাদী লেখকই নন। কয়েকদিন আগেই শুনেছেন খোদ আমেরিকায় রুশদি নামের এক মস্ত বড় লেখকের চোখে ছুরি মেরে দিয়েছে। মুহাম্মদ কে লিখে নিজের রক্তপাত ঘটানোর কোনও বাসনা আপাতত নেই তাঁর। তারপর স্বেচ্ছায় ছুরি খেতে মন চায় না কারুর। পোকাটি না নড়লে তিনি লিখতেন ই না।
গ্রহের ফেরে শুধু বার বার ফেঁসে যাচ্ছেন।
তিনি ঠিক করলেন, গভীর ভাবে পড়াশোনা শুরু করবেন।
এসব সাম্প্রতিক ঘটনা বা মহাকাব্য নয়। গভীর মানব সত্যকে জেনেই তিনি লেখা শুরু করবেন। ইতিহাস বিজ্ঞান ঘেঁটে কিছু আলোক বর্তিকা বার করবেন তিনি।
সেই উদ্দেশ্যে ঘোর তপস্যায় বসলেন অঘোর বাবু।
পড়াশোনা চলতে থাকল। ঘাড় গুঁজে গুচ্ছের বই পড়তে লাগলেন।
লেখক স্বামীর এহেন অদ্ভুত আচরণে অঘোরবাবুর স্ত্রীও অবাক। এত কিছু লিখেছেন অঘোর বাবু, পড়তে এত হয়েছে বলে দেখেন নি। এবার কী এমন গপ্প লিখবেন যে এত বই!
বাইরের খবর আর তাঁর কাছে পৌঁছাল না। তিনি বইয়ে মুখে রইলেন মাস দুয়েক। তার পর তাঁর মনে হল, এই বিপুল জ্ঞান একটি দুটি বাণীর মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া যাক এই পৃথিবীর অর্বাচীন জনগণের প্রতি।
প্রথমে ধীরে চলো নীতি ই নিলেন। মানুষকে প্রথমেই জটিল তত্ত্ব বলে দিলে, সে বুঝতে পারবে না। তাই প্রথমে খুব সাধারণ কথা।
যুদ্ধ নয় শান্তি চাই,
এ খুব সাধারণ কথা।
যুদ্ধে যে ক্ষতি আছে, তার হাজার প্রমাণ পেয়েছেন অতীতে।
তাই এ জিনিস বোঝায় সমস্যা হওয়ার কথা নয় কারুরই।
অনেক দিন পর ফেসবুক খুলে
লিখলেন, যুদ্ধে ক্ষতি, শান্তিতে উন্নতি।
এদিকে অঘোর বাবু জানেন না বিশ্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী!
ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব।
অঘোর বাবুর সে খেয়াল নেই।
লিখে মোবাইল রেখে পরের দিনের বাণী টি ভাবতে বসলেন। এটা একটু বিজ্ঞান নির্ভর।
” বেশী খাবি তো কম খা।”
বিস্তারিত বললে বলা যায়,
বেশি দিন খাবি তো কম খা।
এ একদম বৈজ্ঞানিক কথা। কম খেলে সুগার প্রেসারের সমস্যা হওয়ার সম্ভবনা কম। এছাড়াও সর্টুইন বেশি পরিমাণে নির্গত হয় বলে আয়ু ও বাড়তে পারে কিছু।
বেশ ফুরফুরে মনে কিছুক্ষণ পরে ফেসবুক খুলে যা দেখলেন তাতে তাঁর পিলে চমকে উঠল।
এই নিরীহ কথাটি তে এত অ্যাংরি রিয়েকশন কেন!
কমেন্ট সেকশন দেখে তো হার্ট অ্যাটাক হওয়ার জোগাড়।
মাকু বাচ্চা, দেশের শত্রু , ছোটলোক, নেমক হারাম, এসব কয়েক টি ছাড়া বাকি সবই ছাপার অযোগ্য।
ঘন্টা খানেক পরে অঘরবাবু কে থানায় যেতে হল।
বাড়িতে তাঁর বেঁচে থাকা দায় হতে পারে। থানায় অভিযোগ ও জমা পড়েছে দেশ বিরোধী কার্যকলাপের জন্য। আপাতত যা খবর পাওয়া গেছে, অঘোর বাবু ওসির টেবিলের সামনে বসে রয়েছেন।
বড়বাবু সামনের টেবিলের উপর পা তুলে অঘোর বাবুকে কখন খান, কখন ঘুমান, এরোপ্লেন চালান কিনা এসব নানান খুঁটিনাটি ও গুরুত্বপূর্ন প্রশ্ন করে দেশপ্রেমের গভীরতা জানার চেষ্টা করছেন।
এবারের মত হয়তো ছাড় পেয়ে যাবেন, তবে ওই সাহিত্য চর্চার পোকাটি নড়া বন্ধ না করলে কতকাল বেঁচে বর্তে থাকেন বলা মুশকিল।

আমার ছিল বাউল হওয়ার শখ,
আমার ছিল জাদু শেখার কথা,
আমার ছিল ঘুমিয়ে পড়ার মন,
নীল আকাশে জড়িয়ে নকশী কাঁথা

হেমন্তের শস্যহীন ন্যাড়া মাঠ অপেক্ষায় থাকবে | বৃষ্টি জলে ধুয়ে কবিতার বীজ বপন করবে নবীন কবির দল | মুক্তক ছন্দে ভরে উঠবে খামার |

অবসন্ন বেলায় ঈশ্বরীর বাগানে, গা এলিয়ে পড়ে ছিল কামরাঙা রোদ, পোড়ো বাড়িটার উঠোন থেকে, উঠে এসে উড়নচণ্ডী হাওয়া দূরান্বয়ী ছায়া দিয়ে

আমি বসে আছি নিস্তরঙ্গ কলরবকূলে, মালতীলতায় এবার ফুল আসেনি, হাঁড়িতে মা ভবানী, উনুনে পুড়ছে অস্তিত্বের ব্যাকুলতা