
জাদুকরের মৃত্যু
আমার ছিল বাউল হওয়ার শখ,
আমার ছিল জাদু শেখার কথা,
আমার ছিল ঘুমিয়ে পড়ার মন,
নীল আকাশে জড়িয়ে নকশী কাঁথা
গোপালবাবু গোলগাল লোক। নিরীহ এবং ভদ্রলোক বলা যায়।সাথে লেখকও, ছোটগল্প লেখেন।
এহেন গোপালবাবু একটু বেকায়দায় পড়ে গেছেন। স্বেচ্ছায় কখনই তিনি এই ঝামেলায় পড়তেন না। ওই হাড় বজ্জাত সুরঞ্জনটার জন্যই তাঁর এই অবস্থা।
সুরঞ্জন হল গিয়ে ” গল্পের হাট” পত্রিকার সম্পাদক। একথা অবশ্য স্বীকার করতে হবে , ওর পত্রিকাতেই গোপালবাবুর আশৈশব লেখক প্রতিভা টি বিকশিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
এখন গল্পের হাট আর সুরঞ্জনের কথা খানিক বলে নেওয়া যাক।
প্রথমে অনেক আবেগ নিয়েই ” গল্পের হাট” বার করতে শুরু করে সুরঞ্জন। বাংলা সাহিত্যে আলাদা স্রোত বইয়ে দেওয়াই হয়তো উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু কিছুদিন যাওয়ার পরেই লিটল ম্যাগাজিন চালানোর ঝামেলা হাড়ে হাড়ে টের পেল। পত্রিকা আছে, লেখক আছে, কিন্তু গ্রাহক কই?
কিন্তু সেও কম চতুর নয়। লিটল ম্যাগাজিন চালানোর সর্বোৎকৃষ্ট পন্থাই সে নিল। ঠিক করল, আমন্ত্রিত লেখা ছাড়া সমস্ত লেখককে চার কপি করে পত্রিকা দেওয়া হবে। বিক্রির দায়িত্ত্ব লেখকের। এতেও পুরো সমাধান হল না। আগে ছোটগল্প ছাপা হত। তাতে মোট আট দশটার বেশী গল্প ছাপা যেত না। অর্থাৎ বড় জোর চল্লিশ পঞ্চাশ টা বই বার করা যায়। তাই সুরঞ্জন ছোটগল্প ছেড়ে অণুগল্প ছাপা শুরু করল। চল্লিশ পাতার মধ্যেই একপাতা সম্পাদকীয়, একপাতা সূচীপত্র, একটা চারপাতার গল্প আর বাকি চৌত্রিশ খানা অণুগল্প। অর্থাৎ কমবেশি দেড়শো খানা বই বেরোতে লাগল।
এটা যখন চালু হল, গোপাল বাবু একটু সন্ত্রস্ত হলেন। সুরঞ্জনকে বললেন,” ভাই, এ কী করছ তুমি? এক পাতায় হয় নাকি? এত কথা মাত্র একপাতা জায়গায়?”
সুরঞ্জন এক গাল হাসে। তারপর বলে, ” আরে দাদা, ঠিক পারবেন। এক পাতা কম নাকি? ঠিক জানি আপনি লিখতে পারবেন।”
গোপালবাবু মেনে নিলেন।
কিছুদিন মকশো করার পর বেশ সহজ হয়ে গেল ব্যাপারটা।
মাস খানেক যায়নি, সুরঞ্জন আবার ফতোয়া জারি করল।
” কুড়িটি শব্দে লিখুন।”
গোপালবাবু বাক্যহারা হলেন। ভাবলেন,’ রবীন্দ্রনাথ ছোটগল্পের বর্ণনায় ” অন্তরে অতৃপ্তি রবে” আর ” শেষ হয়ে হইল না শেষ” এই দুটি কথা বলে বাংলা ছোটগল্পের ভবিষ্যৎ কোন মুখে ঠেলে দিয়েছেন সেটা আজ বেঁচে থাকলে বুঝতেন। মনে হয় কথাগুলো উইথড্র করে নিতেন।’
গোপালবাবু হাঁফ ছাড়লেন। তারপর কুড়িটি শব্দের খোঁজে বেরোলেন। আশ্চর্যের কথা তিনি পেয়েও গেলেন। সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই, তিনি যাবতীয় কথা কুড়ি শব্দেই শেষ করে দিতে লাগলেন। হ্যাঁ, অতৃপ্তি রইল, শেষও ঠিক হল না, কিন্তু সাঙ্গ হয়ে গেল।
কিন্তু হোয়াটস অ্যাপ এ সুরঞ্জন আজ যেটা পাঠিয়েছে সেটা দেখে গোপালবাবু আগুন হয়ে গেছেন। অসভ্যতারও একটা সীমা থাকা দরকার।
” দাদা, এবারের সংখ্যায় একটি বিশেষ চমক। আপনার কাছে চাইছি একটি দুই শব্দের গল্প। ঠিক পারবেন জানি। হোয়াটস অ্যাপে পাঠিয়ে দিন আমাদের কাছে। মাত্র দুটি শব্দে।”
কিন্তু গোপালবাবু জাত লেখক। রাগ একটু কমতেই কাজে লেগে পড়লেন।
একটু রেফারেন্স দরকার। দুই শব্দের গল্প জীবনে পড়েন নি। সেগুলো দেখতে কেমন হয় সেটা জানা দরকার আগে।
তিনি ইন্টারনেটে এতটা সাবলীল নন। তবুও গুগলে গিয়ে টাইপ করলেন। উঁহু, কিচ্ছু নেই।
হঠাৎ গোপাল বাবুর ফেসবুকের কথা মনে পড়ল। এখন কম বয়সীরা ফেসবুক থেকেই সব তথ্য পায় বলে শুনেছেন। যে ইতিহাস বইয়ে নেই, ইন্টারনেটে নেই, সেই ইতিহাস নাকি ফেসবুক হোয়াটস অ্যাপ এ পাওয়া যায়।
ফেসবুকের সার্চ বারে টাইপ করতেই বুঝলেন, একদম ঠিক জায়গায় এসে পৌঁছে গেছেন। দুই শব্দের গল্পের পেজ গ্রুপ সবই আছে। সেরকমই একখানা পেজে ঢুকে পড়লেন গোপাল বাবু – ” দুই শব্দের খাজানা”।
পেজের প্রথম পরিচিতি টি বিশাল।
” সাহিত্যের প্রকাশের জায়গায় ফেসবুকই একমাত্র সাম্যবাদী স্থান। ভেবে দেখুন, তাহলেই বুঝবেন। বড় বড় প্রকাশনা সংস্থায় আপনার লেখা স্থান পাবে না। হয় মানের অভাবে নয়তো নামের অভাবে বাদ যাবেন।
ছোট পত্রিকাও সবার জন্য নয়। আমাদের দেশের শত শত শিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত বালক বালিকা, যুবক যুবতী, বৃদ্ধ বৃদ্ধারা কি কবিতা গল্প লিখবেন না? ফেসবুক তাঁদের সামনে মানের বাধা, নামের বাধা তুলে ধরে নি, বানানের বাধাও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সকল প্রকার বানানের, ভাবের, রসের সাহিত্য গঙ্গার জলের মতো ফেসবুকে প্রবাহিত…”
গোপালবাবু একটু বিরক্ত হয়েই থেমে গেলেন। দুই শব্দের গল্পের পেজ, তাতে দুপাতার ভূমিকা কেন বাপু??
একটু নিচুতে নামতেই দুই শব্দের ভান্ডার বেরিয়ে পড়ল।
” কুঃকু! বসন্তকাল।”
প্রথম গল্প। ফুড়ুৎ করে শেষ।
গোপালবাবু ধরার আগেই হাত ফস্কে বেরিয়ে গেল।
পরেরটায় গেলেন।
” খুক! নিঃশব্দতা।”
এ কি অসভ্যতা।
গোপালবাবু রেগে মেগে ফিরেই যাচ্ছিলেন, হঠাৎ নজরে পড়ল এটা।
” অমিত। আমার।”**
কী এটা?
একটু খুঁটিয়ে দেখতেই লক্ষ্য করলেন, লেখার নীচে অনেকটা ফাঁকা জমি, পাশে আবছা করে লেখা এ চাপ দিতেই * দেওয়া এক প্রকাণ্ড লেখা বেরিয়ে পড়ল।
লেখিকা মিতা মারিক দুটি শব্দকে বোঝাতে হাজার দুয়েক শব্দ ঢেলে দিয়েছেন।
গোপালবাবু উৎসাহিত হন।
উনি লিখেছেন,” দুটি শব্দ। কিন্তু ক্ষমতা কম নাকি? তার উপরে যতিচিহ্নের স্বাধীনতা আছে। এগুলোর ক্ষমতাও কম নয়। আমি যেমন দেখুন কেমন দুটো পূর্নচ্ছেদ দিয়ে দিয়েছি!
এবার প্রথম শব্দে আসি।
‘ অমিত ‘ – আপনারা ভাবছেন, কেন সুমিত হলে কী হত? সৃজন হলেও দোষ ছিল কি?
ভাবছেন হয়তো প্রেমিকের নাম। ( সাথে একটি হাসির ইমোজি, তার আবার এক চোখ বন্ধ।) কিন্তু সেকারণে নয়। অমিতের শুরু অ দিয়ে – অ প্রথম অক্ষর, অর্থাৎ অমিত প্রথম ভালো লাগা, প্রেম বলতে পারেন। কিন্তু অমিতের পর পূর্নচ্ছেদ কেন?
হাইফেন নয় কেন? কেন নয় বিস্ময়সূচক চিহ্ন?”
গোপালবাবুও ভাবেন ,” তাই তো?”
লেখিকা উত্তর দিয়েছেন,” হাইফেন নয়, কারণ অমিতকে পাওয়া হয়ে গেছে, তাকে আর ডাক দিতে হচ্ছে না। সেও আমার পিছনে নেই, আমিও তার পিছনে নেই। আমরা দুজন একসাথে।
বিস্ময় সূচক চিহ্ন নেই, কারণ সেই বালিকা বা কিশোরীর চমকে ওঠা প্রেম এখন আর নেই। প্রেম পরিণত হয়েছে। তাই বিস্ময়ের জায়গায় পূর্ণচ্ছেদ। আর কমা নেই কেন বলছেন? আরে এটা তো বোঝা দরকার দাদা! অমিত ছাড়া আর কারোর ভাবনাই নেই মনে, তাই কমা দিয়ে কী করব?”
গোপালবাবু সজোরে বলে ওঠেন ,” খাসা তো! ” লেখিকা লিখেছেন ফের ,” এবার দ্বিতীয় শব্দ। ‘ আমার ‘ । এ তো জলের মতো সহজ। অধিকারবোধ। এখানেও বিস্ময় নেই, কমা নেই, পুরো পূর্ন চ্ছেদ। পাওয়া এবং প্রেম আছে, কিন্তু নিরুত্তাপ, স্থায়ী ভালোবাসা। দায়িত্বশীল, পূর্ণচ্ছেদের দৃঢ়তায় শক্ত ভিত ।
অমিত আগে কেন?
আরে ওর জয়েই আমার আনন্দ।
এবার দাঁড়ান, এখানেই শেষ নয়।
দুজনের মাঝে ছেদ কেন?
তাহলে কি মনোমালিন্য? নাকি দুটি আলাদা সত্ত্বা বোঝানোর জন্য?
দুজন মানুষ, স্বাধীন, কিন্তু ভালোবাসার বন্ধনে একটি গল্পে আবদ্ধ ?
এর উত্তর তো পাবেন না। একেই তো অতৃপ্তি বলে। অতৃপ্তি থাকে বলেই এটা গল্প। “
গোপালবাবু বলে ওঠেন,” বাহ্! খাসা তো! “
মনে মনে ভাবলেন ” শুধু শুধু শব্দক্ষয় করা হয়ে গেছে কত!”
গোপালবাবু আর একটু নামলেন ।
” দুধের -সর। আমার -জ্বর। “
গোপালবাবু হা – হা করে ওঠেন, ” এ তো চিটিং। ” মাঝে তো শর্ট হাইফেন দিয়ে জুড়ে দিয়েছে। চার শব্দের জায়গায় দু শব্দ করে দিয়েছে। ”
কমেন্ট সেকশন এ প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। এখানে তো আর দুই শব্দের বাঁধন নেই। লোকজন চরম খিস্তি দেওয়া শুরু করেছে। দুই শব্দে গল্প ধরেন যাঁরা তাঁরা এই চিটিং সহজে মেনে নিতে রাজী নন।
গোপালবাবু কমেন্ট দেখতে দেখতে তন্ময় হয়ে গিয়েছিলেন। কখন যে ঘণ্টা দুয়েক কেটে গেছে বুঝতেই পারেন নি।
মোবাইল থেকে যখন চোখ তুললেন, চোখে তখন সর্ষে ফুল দেখছেন।
মাথা কমেন্ট সেকশন এর খিস্তি আর কচকচানি তে ভর্তি।
ঘাড় টাকে সোজা করতে যেতেই , বিদ্যুৎ ঝলকের মতো এসে গেল মাথায়।
একেই বোধ হয় বলে কবিতায় ভাব আসা।
কিংবা ভক্তের স্বপ্ন পাওয়া।
ধড়মড় করে মোবাইল খুলে তাড়াতাড়ি সুরঞ্জনের কন্ট্যাক্ট টা বার করলেন গোপালবাবু।
হ্যাঁ, এই তো লেখা আছে —
“….হোয়াটস অ্যাপে পাঠিয়ে দিন আমাদের কাছে। মাত্র দুটি শব্দে।”
শান্তশিষ্ট গোপাল বাবু কাঁপা কাঁপা হাতে কোনও রকম কমা , পূর্নচ্ছেদ ছাড়াই টাইপ করলেন দুটি শব্দ —
” ভাগ শালারা –“

আমার ছিল বাউল হওয়ার শখ,
আমার ছিল জাদু শেখার কথা,
আমার ছিল ঘুমিয়ে পড়ার মন,
নীল আকাশে জড়িয়ে নকশী কাঁথা

হেমন্তের শস্যহীন ন্যাড়া মাঠ অপেক্ষায় থাকবে | বৃষ্টি জলে ধুয়ে কবিতার বীজ বপন করবে নবীন কবির দল | মুক্তক ছন্দে ভরে উঠবে খামার |

অবসন্ন বেলায় ঈশ্বরীর বাগানে, গা এলিয়ে পড়ে ছিল কামরাঙা রোদ, পোড়ো বাড়িটার উঠোন থেকে, উঠে এসে উড়নচণ্ডী হাওয়া দূরান্বয়ী ছায়া দিয়ে

আমি বসে আছি নিস্তরঙ্গ কলরবকূলে, মালতীলতায় এবার ফুল আসেনি, হাঁড়িতে মা ভবানী, উনুনে পুড়ছে অস্তিত্বের ব্যাকুলতা
One Response
🤣 “গোপালবাবু শেষমেশ বুঝলেন—দুই শব্দে গল্প নয়, দুই শব্দেই গালাগাল চলে!
বর্তমানের এরকম একটি বাস্তব সাহিত্যধারার বিরক্তিকর চলন লক্ষ্য করা যায় , সেই বাস্তবতা এমন হাস্যরসাত্মকভাবে উপস্থাপন সত্যই নির্মল আনন্দের সঞ্চার করে
একটু অতুলনীয় নিখাদ হাস্যরসের স্বাদ পেলাম