
জাদুকরের মৃত্যু
আমার ছিল বাউল হওয়ার শখ,
আমার ছিল জাদু শেখার কথা,
আমার ছিল ঘুমিয়ে পড়ার মন,
নীল আকাশে জড়িয়ে নকশী কাঁথা
ঘটনার শুরু শনিবার সকালে।
আমাদের পাড়ার এক উঠতি কবি ভাই সাত সকালে এক কবিতা পাঠাল। কোনও এক উঠতি পত্রিকার কবি এই কবিতার ছবি তাঁকে পাঠিয়েছে। সে আমার সাথে এই কবিতার বিষয়ে আলোচনা করতে চায়। অর্থাৎ কবিতার হাড় মাস একাকার করতে চায়। কিন্তু সঙ্গী হিসেবে আমিও যেন হাত লাগাই।
আমি ফোনটা এদিক ওদিক ঘুরিয়ে ভালোভাবে জিনিসটি দেখার পর বুঝলাম, ভাইটির কাজে আমার হাত লাগানোর কিছু নেই। কবিতাটি হাড় সর্বস্ব, সেখানে মাংস বা মেদ কিছুই নেই।
হালকা চালে তাঁকে লিখে পাঠালাম, ” এটা কেও জাল করেছে, মূল কবিতা উড়িয়ে তার জায়গায় শূন্য বসিয়ে দিয়েছে। ”
কিছুক্ষণ কোনও মেসেজ নেই আর।
আমি উঠব উঠব করছি, এমন সময় দরজায় করাঘাত। করাঘাত লিখছি বটে, কিন্তু শব্দ শুনে পদাঘাত ই মনে হল যেন।
দরজা খুলতেই এক কালবোশেখি ঝড় হয়ে সেই ভাই ঢুকল।
” দেখুন।নিজের চোখেই দেখুন। ” বলেই লাল মলাটের এক পত্রিকা খুলে ফেলল।
সেখানে ফের একবার ডজন খানেক গোলাকার বস্তুর সাথে আমার দুই চক্ষুর মিলন হল।
আমি মিনিট খানেক গুম হয়ে রইলাম।
তা দেখে ভাইটির রাগ হল বোধ হয়।
পটাং করে কবিতাটি ছিড়ে আমার হাতে দিয়ে বলল, ” এটা রাখুন । পড়ুন আর ভাবুন। সন্ধ্যের দিকে এসে আলোচনায় বসব।”
আমি ছেঁড়া পাতায় বদ্ধ শূন্য ময় কবিতাটির দিকে তাকিয়ে একটু পায়চারি করলাম।
পাঠকদের জ্ঞাতার্থে কবিতাখানি টুকেই দিলাম।
শূন্য শুধু শূন্য/
কলম বাগচি
০০০০ ০০০০ ০০০
০০০০ ০০০০০০ ০০০ —
০০০ ০০০ ০০০
০০০০ ০০০ ০০০
০০০০ , ০০০০ , ০০০
০০০০ ০০০ ০০০০
শেষমেষ কবিতা বুঝতে প্রচেষ্টা শুরু করতে হল।
প্রথমে এক কবিকেই পাকড়াও করেছিলাম।
কিন্তু এত শূন্য দেখে তিনি আমার দিকে শুন্যদৃষ্টিতে অনেক ক্ষণ চেয়ে রয়ে শেষে আর কিছুই বললেন না।
অগত্যা কী করব।
আমার পাশেই এক ইতিহাসের মাষ্টারমশাই থাকতেন। তিনি নাকি অগ্নিযুগের গবেষক। এটিকে দেখে আমাকে ফিস ফিস করে বললেন, আরে ভাই খাজানা পেয়েছ তো তুমি। এ হচ্ছে বারীন ঘোষের বোমা, মুরারিপুকুর বাগানবাড়িতে তৈরি হত।
আমি অনেক কষ্টে তাঁর কবল থেকে মুক্ত হয়ে কবিতাটির কোনও রাজনৈতিক দিক আছে কিনা ভেবে দেখতে বসলাম।
শেষে ভাবলাম, খোদ রাজনীতিকদের কাছে যাওয়া যাক।
মোড়ের মাথায় এক কমরেড থাকেন। সকালে বারান্দায় বসে লাল চা খাচ্ছিলেন।
গিয়ে সেখানেই কবিতা দেখালাম।
শূন্য দেখে তিনি এত ক্ষেপে উঠবেন ভাবিনি।
আমার সাদা মনে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির কোনও ভাবনা ছিল না। কিন্তু সেই শান্ত শিষ্ট ভদ্রলোক চপ্পল ছোঁড়াছুঁড়ির চেষ্টা করতে আমি চম্পট দিলাম।
কী জানি মানুষ এত হিংস্র কেন হয়ে উঠছে এত শূন্যময় কবিতা দেখে।
দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে কোথাও লেগে নুন ছাল উঠে গিয়েছিল। সেখানে বেশ জ্বালা জ্বালা ভাব। রাস্তায় এক হনুমান মন্দির পড়ে। তার সামনে বেশ কিছু গেরুয়া পাঞ্জাবি পরা ছেলে দাঁড়িয়ে। পিলে চমকানো ” জয় শ্রী রাম” ডাক ছাড়ল একখানা, কাছে যেতেই।
আমি একটু পরে খানিক ভয়ে ভয়ে সেই কাবিতাকীর্ণ কাগজ খানা বার করলাম। ভাইয়েরা চোখ চাওয়া চাওয়া করল।
মানেটা ঠিক বোধ গম্য হচ্ছে না।
” গরুর বিষয়ে কিছু? নাকি জওহরলাল?””
” সোনা মনে হচ্ছে!”
” পাকিস্তানের জিডিপি নিয়ে কিছু বলছিল কাল দাদা।”
একটা ছেলে একটু গম্ভীর হল। তারপর বলল, ” দাদা তো নেই। আপনি সন্ধ্যের দিকে এলে বলে দিতে পারবে।”
তখনই যে ছেলেটি কাগজখানা দেখছিল, সে
উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
” বেশ। এ তো স্পষ্ট।’
ডজন খানেক চোখ চক চক করে উঠলো সঙ্গে সঙ্গে।
” এ তো সহজ।
এগুলো তো ছেলের মাথা। পাল পাল ছেলে। আন্ডা বাচ্চা বলে না!
আন্ডা টা রেখে বাচ্চা টা উহ্য রেখেছেন কবি।
এভাবেই পালে পালে বাড়ছে ওরা।
কারা নিশ্চয়ই বুঝছেন।”
পরের এক ঘন্টা ছেলের দল আমাকে পাকিস্তান, মুসলমান, জওহরলাল, আর দেশদ্রোহী মিলিয়ে একটা মিক্সড veg supply করল।
যদিও বাক্য অনেক সময় নন ভেজ হয়ে যাচ্ছিল।
এক ঘন্টা পর ছাড় পেলাম।
তারপরেই হনুমান মন্দির থেকে একটা শর্ট কাট নিলাম। অনেক নীলসাদা ঘর পেরিয়ে রাস্তায় উঠেই একেবারে দু দুটো আট স্পিকার বক্সের সম্মুখীন হলাম।
একদল ঘুরে ঘুরে নাচছে।
পেরিয়েই যাচ্ছিলাম, হঠাৎ নজরে পড়ল টেবিল ভর্তি ” বাংলা জাগো”কাগজ।
একটু ভরসা পেলাম।
আমার হাতের কাগজ দেখেই একজন এগিয়ে এল টলতে টলতে । এত ঘুরে ঘুরে নাচতে গিয়ে মাথা ঘুরে গেছে হয়তো।
সেজন্য ই বোধ হয় সে শূন্য গুলোকে ফুটবল দেখতে শুরু করল। তারপর আমার হাত ধরে কি নাচ টাই না নাচল।
” দাদা, খেলা হবে, খেলা হবে দাদা খেলা হবে..”
নাচ টাচ একটু কমলে পরে আমি একটু দূরে নিয়ে গিয়ে কবিতাখানি চোখের সামনে ধরলাম। সে বুঝি একটু বিরক্ত হল। তাঁর মনে হল, গোল গোল জিনিসগুলি মার্বেল হতে পারে, কিন্তু কদাচ ফুটবল হতে পারে না।
সেকারনেই একটু ভাবিত হলেন বুঝি। তারপরেই এক হাঁড় কাঁপানো ডাক ছাড়লেন, ” ইউরেকা!”
আমি চমকে তাঁর দিকে তাকালাম।
তিনি সোল্লাসে চিৎকার করলেন, ” আরে মশাই, এ তো ডিম। রাশি রাশি ডিম।
আমাদের ডিম্ভাতের ডিম। কত বিলিয়েছি, পুরো মনে পড়ে যাচ্ছে। “
পরক্ষনেই টেনে নামালেন নাচে, ” খেলা হবে খেলা হবে…”
যখন ছাড়া পেলাম তখন সন্ধ্যে ঘনিয়ে এসেছে।
আমাদের পাড়া টা একটু দূরে।
মাঝখানে অনেক খানি রাস্তায় বাড়ি ঘর নেই। রাস্তার দু ধারে বড়ো বড় অশ্বত্থের গাছ রয়েছে।
লোকজন ও দেখছি না কাওকে।
হাতে কবিতার পাতাটি নিয়েই হাটতে লাগলাম।
একটু যেতেই দু পাশে সারি সারি অশ্বত্থ গাছ।
আনমনেই হাঁটছিলাম।
হঠাৎই মাথায় যেন কী ঠুকে গেল।
হাত বাড়াতেই দেখি , বেশ ঠাণ্ডা এক খানা কিছু ঠেকছে হাতে।
আর একটু ভালোভাবে হাত চালাতেই ঠাহর হল, একি! মানুষের পা মনে হচ্ছে যে!
উপরে একটু ভালোভাবে একটু তাকাতেই তারা আর চাঁদের মিশ্র আলোয় একখানা পরিচিত মুখই ভেসে উঠল। আমার তখন হাত পা ঠোঁট কাঁপতে শুরু করেছে।
এই মুখটি বইয়ের পাতায় দেখেছি। স্বর্গীয় শিবরাম চক্কোত্তি আমাদের পাড়ায় এসে পা দোলাচ্ছেন কেন??
উত্তর উপর থেকেই পেলাম, ” এঁ! পাতা ভর্তি রসগোল্লা নিয়ে কোথায় চললি ?
কতকাল যে রসগোল্লা খাই নাই, বা পাই নাই। পাই পয়সাই নাই, তো আর..”
আমার মাথা দেখি একে একে চিন্তাশুন্য হচ্ছে,
আশেপাশের গাছ পালা, আকাশ, পরলোক থেকে আগত শিবরাম, আকাশের চাঁদ একে একে শূন্যে মিলিত হচ্ছে।
সে এক মহাশূন্যের সৃষ্টি হচ্ছে যেন, বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড ফের গোত্তা খেয়ে শুরুর শূন্যে ফিরে যাচ্ছে যেন।
সেই মুহূর্তেই আধো চেতনায় সেই শূন্যময় কবিতার মানে আমার কাছে জলের মত হয়ে গেল। শূন্যের ভাব আমার ‘ পরানে পশিল ‘।
তারপরেই আমি চেতনাশূন্য হলাম।

আমার ছিল বাউল হওয়ার শখ,
আমার ছিল জাদু শেখার কথা,
আমার ছিল ঘুমিয়ে পড়ার মন,
নীল আকাশে জড়িয়ে নকশী কাঁথা

হেমন্তের শস্যহীন ন্যাড়া মাঠ অপেক্ষায় থাকবে | বৃষ্টি জলে ধুয়ে কবিতার বীজ বপন করবে নবীন কবির দল | মুক্তক ছন্দে ভরে উঠবে খামার |

অবসন্ন বেলায় ঈশ্বরীর বাগানে, গা এলিয়ে পড়ে ছিল কামরাঙা রোদ, পোড়ো বাড়িটার উঠোন থেকে, উঠে এসে উড়নচণ্ডী হাওয়া দূরান্বয়ী ছায়া দিয়ে

আমি বসে আছি নিস্তরঙ্গ কলরবকূলে, মালতীলতায় এবার ফুল আসেনি, হাঁড়িতে মা ভবানী, উনুনে পুড়ছে অস্তিত্বের ব্যাকুলতা
One Response
👽 উপগ্রহ
শূন্যতা নিয়ে এমন রসিক, ব্যঙ্গমিশ্রিত এক অভিযান সত্যিই দুর্দান্ত! শিবরামীয় টানে সমসাময়িক কটাক্ষ ও কল্পনার অপূর্ব মিশেল। পড়ে ভরপুর আনন্দ পেলাম।