
জাদুকরের মৃত্যু
আমার ছিল বাউল হওয়ার শখ,
আমার ছিল জাদু শেখার কথা,
আমার ছিল ঘুমিয়ে পড়ার মন,
নীল আকাশে জড়িয়ে নকশী কাঁথা
সার্জারি ডিউটির সময় আমাদের স্যার একটা খুব ভালো উপদেশ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ” হাত ধোয়া হয়ে গেলে কখনও আর পিছনে বা কোমরের নিচে হাত নিয়ে যাবি না, আর হাত না ধুয়ে ও টি তে ঢুকলে হাত কখনও সামনে আনবি না, পিছনে রাখবি।”এই কড়াকড়ির কারনটা সহজবোধ্য। অপারেশনের সময় সংক্রমণ হলে তা প্রাণঘাতী হতে পারে। কিন্তু সাধারন ওয়ার্ডেও কি এরকম কড়াকড়ি হয়?
বা এরকম সাবধানতা জরুরি?
যাঁরা দু একবার হাসপাতালে গেছেন তাঁরা জানেন এটা করা অসম্ভব ব্যাপার। তবে হাত ধোয়ার দরকার এখানেও খুব বেশী। কেন, তার কথায় পরে আসছি।
হাসপাতাল ছেড়ে যদি আমজনতার দিকে দেখি তাহলে দেখতে পাবো, আজ থেকে মাসখানেক আগেও সাধারন মানুষের খাবার খাওয়ার আগে হাত ভিজিয়ে নেওয়ার মধ্যেই হাত ধোয়া সীমাবদ্ধ ছিল। যাঁরা আর একটু সচেতন তাঁরা সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ ব্যবহার করতেন। কিন্তু সাধারন মানুষ হাত ধোয়ার পদ্ধতি নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে এটা দেখা যেত না। করোনার প্রত্যক্ষ ভীতি কেটে গেলে কতজন এই অভ্যাস বজায় রাখেন সেটাও দেখার। এই অভ্যাস বজায় রাখা খুব একটা সহজ কাজ নয়। হাসপাতালে হাত ধোয়ার অভ্যাস তৈরী করতে সেই আঠেরোশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে যে চেষ্টা চলছে তা আজও সর্বাংশে সফল হয়েছে সেটা বলা যায় না।এই ইতিহাসে সবার আগে যাঁর নাম আসে, তিনি ইগনাজ সেমেলওয়েস( Ignaz Semmelweis)। তাঁর কথাই বলবো আজ।
১৮৪৭ সাল। স্থান: ভিয়েনার জেনারেল হাসপাতাল। সেমেলওয়েস নিযুক্ত হলেন স্ত্রী ও প্রসূতি বিভাগের ডাক্তার হিসেবে।সে সময় প্রসূতি জ্বরে প্রচুর রোগী মারা যেতেন। বাচ্চার জন্ম দেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে ধুম জ্বর আর তারপরেই মৃত্যু। সারা ইউরোপ জুড়ে একই ছবি। সেমেলওয়েস এক অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করলেন। তাঁর হাসপাতালে পাশাপাশি দুটো ওয়ার্ড। একটায় ডাক্তার আর ডাক্তারি ছাত্ররা প্রসব করান। অন্যটায় ধাইরা। কিন্তু পরিসংখ্যানে দেখা গেল যে ওয়ার্ডে ডাক্তাররা প্রসব করান সেখানে প্রসূতিজ্বর এবং তাতে মৃত্যুর সংখ্যা অন্য ওয়ার্ড থেকে প্রায় পাঁচ গুণ বেশী। কেন? এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। কারন খুঁজতে শুরু করলেন সেমেলওয়েস।
প্রথমেই তিনি দেখলেন এই দুটো ওয়ার্ডের মধ্যে পার্থক্য গুলো কি?
প্রথম পার্থক্য প্রসব করানোর পদ্ধতিতে। ডাক্তাররা চিৎ করে শুইয়ে দেন মাকে, তারপর হয় প্রসব। ধাইয়েরা একপাশে শুইয়ে করেন। এর কোনো যোগ আছে নাকি? নাহ্। এই বিষয় বাদ গেল।
আর একটা বিষয় সামনে এলো তাঁর। তিনি লক্ষ্য করলেন, যখনই প্রসূতি জ্বরে কেও মারা যায় একজন পাদ্রী ঘণ্টা বাজিয়ে যান আর নানান ধর্মীয় অনুষ্ঠান করেন মৃতদেহের কাছে। আর তিনি যান এই ডাক্তাররা যে ওয়ার্ডে কাজ করেন সেটা দিয়েই। তিনি একটা তত্ত্ব খাড়া করলেন। ওই ঘণ্টার শব্দ শুনেই সদ্য বাচ্চার জন্ম দেওয়া মায়েরা ভয় পেয়ে যান, আর জ্বরে আক্রান্ত হন। পাঠকেরা খেয়াল রাখবেন, তখনও রোগের পিছনে জীবাণুর তত্ত্ব আসতে বছর চল্লিশেক বাকি। তখন যে সার্জেন এর এপ্রন যত বেশি নোংরা আর রক্তমাখা থাকতো তাঁকে তত বড়ো ডাক্তার ভাবা হতো। জোসেফ লিস্টারের জীবাণুমুক্ত ভাবে অপারেশন করার ভাবনা আসতেও অনেক দেরী।
সেই সময়ে বসে সেমেলওয়েস এই কথা ভাবছেন। তা সেই পাদ্রীর যাওয়া আর ঘণ্টা নাড়া বন্ধ করা হল। কিন্তু ফল কিছু হল না। রোগী মারা যাওয়ার হার একই থাকলো। এবার সেমেলওয়েস খুব হতাশ হলেন। হাসপাতালের কাজ কিছুদিনের জন্য ছেড়ে চলে গেলেন বেড়াতে। মন একটু ভালো হবে। চিন্তাভাবনাগুলোও ভালো আসবে।
যখন ছুটি কাটিয়ে ফিরে এলেন তখন শুনলেন প্যাথলজি বিভাগের একজন ওই প্রসূতি জ্বরের মতো লক্ষণে ভুগছেন। একজন প্রসূতি জ্বরে মারা যাওয়া রোগীর পোস্টমর্টেম করার সময় হঠাৎ তাঁর নিজের আঙুলে কেটে গিয়েছিল। তারপরেই তিনি আক্রান্ত হন জ্বরে।
সেমেলওয়েস ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন লক্ষণ গুলো। ঠিক প্রসূতি জ্বরের মতোই সেগুলো। তাহলে শুধু প্রসবের পরেই নয়, ওই মৃতদেহ থেকেও ছড়াতে পারে রোগ। সাথে সাথে মনে পড়লো তাঁর। ডাক্তার এবং ছাত্ররা তো পোস্টমর্টেম করার পরেই সেখান থেকে চলে যান প্রসূতি বিভাগে। বেশীর ভাগই হাত না ধুয়েই। তিনি দুই আর দুই এ চার করলেন। নিশ্চয়ই মৃতদেহের কিছু অজানা উপাদান লেগে থাকে তাঁদের হাতে। সেটার মাধ্যমেই সংক্রমণ হয়। সমাধান বার করলেন তিনি। লাশঘর থেকে আসার পর ক্লোরিন জলে হাত জীবানুমুক্ত করতে হবে আগে। তারপরেই যাওয়া যাবে প্রসূতি বিভাগে। এই সামান্য ব্যবস্থা তেই অসাধারন ফল পাওয়া গেল। মৃত্যুর হার কমে গেল একেবারে। কিন্তু যেটা হওয়ার ছিল সেটা হল না।
সেমেলওয়েসের তত্ত্ব স্বীকার করলেন না সেসময়ের চিকিৎসকরা। যাঁরা রোগীদের সেবায় নিয়োজিত, তাঁদের হাত থেকেই সংক্রমণ ছড়াচ্ছে, এই ব্যাপারটাও মেনে নেওয়া একটু কষ্টকর হয়ে পড়ল তৎকালীন চিকিৎসকদের পক্ষে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভাবলেন , নতুন যে ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা চালু হয়েছে ওই বিভাগে সে কারণেই কমেছে সংক্রমণ। এর পিছনে কারনও ছিল। তখন ধারনা ছিল দূষিত বাতাসের কারনেই যাবতীয় রোগ অসুখ হয়।
যাই হোক। সেমেলওয়েস বদলি হয়ে গেলেন অন্য হাসপাতালে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি যেন আরও বেশী জেদী আর নাছোড়
বান্দা হয়ে উঠলেন। সারাক্ষন বেসিনের সামনে দাড়িয়ে থাকতেন , আর যে নার্স বা ডাক্তার হাত ক্লোরিন জলে না ধুয়ে যেতেন তাকে যাচ্ছেতাই রকম অপমান আর গালিগালাজ করতেন। ফল হিসেবে, বেশীর ভাগই তাঁকে এড়িয়ে চলতে লাগল। নিজের হাসপাতালেই অসংখ্য সহকর্মীর বিরাগভাজন হলেন। ক্রমশ তাঁর মধ্যে মস্তিস্ক বিকৃতি দেখা যেতে লাগলো। তাঁকে মানসিক রোগীদের সাথে রাখা হল পাগলাগারদে। তখনকার পাগলা গারদগুলোর অবস্থা ভয়ঙ্কর ছিল। রোগীদের শান্ত রাখার জন্য প্রচণ্ড মারধর আর শারীরিক কষ্ট দেওয়া হত। সেমেলওয়েসকেও মারা হত । শোনা যায় সেই ক্ষত সংক্রমণের কারণেই মারা যান তিনি। মাত্র সাতচল্লিশ বছর বয়সে। কিন্তু এই কাহিনীর আরও একটা দিক আছে যেটা নিভৃতে থেকে যায়।
সেমেলওয়েস নিঃসন্দেহে অসম্ভব ভালো চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী ছিলেন। তাঁর আবিষ্কার এবং প্রসূতি জ্বর আটকানোর পন্থা খুব কার্যকরী ছিল। কিন্তু সেই আবিষ্কার করার পর তিনি তাঁর কোনো ব্যাখ্যা দেন নি। তাঁর সহকর্মীরা যখন ক্লোরিন জলে হাত পরিষ্কার করার ব্যাখ্যা চান তখন তাঁদের কাছে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পেশ করার বদলে তাঁদের আক্রমণ করতে শুরু করেন। লিখে পাঠান,” আপনাদের মত লোকজনরা হাজার হাজার মৃত্যুর জন্য দায়ী।” বা ” আপনারা ঠান্ডা মাথার খুনী। আমার তত্ত্বে বিশ্বাস না করে ঠান্ডা মাথায় খুন করছেন হাজার হাজার মানুষকে।” হাত ধোয়ার ব্যাপারটাও কার্যকরী করতে গিয়ে যে পন্থা অবলম্বন করেছিলেন সেটাও ঠিক ছিল না। সেই সময় যে তত্ত্ব টা সন্দেহের উর্ধ্বে ছিল না, সেটাকে প্রয়োগ করার জন্য সেমেলওয়েস রাগ দেখানো, অপমান করা এই পন্থা গুলি অবলম্বন করেছিলেন, যেটা মোটেই কার্যকরী ছিল না। তিনি অসাধারন চিকিৎসা বিজ্ঞানী ছিলেন, কিন্তু তাঁর আবিষ্কার বাস্তবে প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে তাঁর কিছু ভুল হয়তো থেকে গিয়েছিল।
এই দিকটি তুলে ধরার একটা কারন আছে। হাসপাতালে হাত ধোয়ার সমস্যাটি আজও আছে। অনেক সময় নসোকোমিয়াল ইনফেকশন স্বাস্থ্যকর্মীদের হাতের মাধ্যমেই এক রোগী থেকে অন্য রোগীদের মধ্যে ছড়িয়ে যায়। আর সেই সংক্রমণ মারাত্মক হয়। আর সরকারি হাসপাতালের অসম্ভব রোগীর চাপে প্রতি রোগী দেখার পর বেসিনে গিয়ে ৩০ সেকেন্ড ধরে হাত ধোয়া সম্ভব নয়। সে কারনেই এখন স্যানিটাইজার, অ্যালকোহল জেল ব্যবহারে আসছে। অদূর ভবিষ্যতে আরও ভালো কিছু ব্যবস্থাও আসবে নিশ্চয়ই। কিন্তু হাত ধোয়ার ইতিহাসে ইগ্নাজ সেমেলওয়েস নামটা একরাশ শ্রদ্ধা আর মন খারাপ নিয়ে স্মরণ করা হবে সব দিন।
( শোনা যায়, ফুটবলের বাংলা করতে বলেছিলেন আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু। একজন ছাত্র পাদগোলক বলায় তিনি আনন্দে তাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার পক্ষে তার পক্ষপাত ছিল। কিন্তু বিজ্ঞানের ইংরেজি নামগুলোর প্রকৃত বাংলা প্রতিশব্দ যদিও বা পাওয়া যায় সাধারন মানুষের কাছে সেগুলো ইংরেজি শব্দের থেকে বেশী অচেনা লাগে। এই লেখায় প্রচুর ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করলাম। এগুলোর বাংলা হয়তো করা যেত , কিন্তু সেগুলো আমার কাছেই কৃত্রিম লাগতো।)
তথ্যসূত্র:
১. ” On Handwashing” , Atul Gawande (Book ” Better”)
২. ” The doctor who championed Handwashing and Briefly saved life” by Rebecca Davies (www.npr.org)
৩. ” The Origin Of Handwashing” by Requel Kahler
৪. ” Ignaz Semmelweis and the Birth of infection control” by M Best, D Neuhauser (BMJ)
৫. ” History Of Medicine ” by Kate Kelly

আমার ছিল বাউল হওয়ার শখ,
আমার ছিল জাদু শেখার কথা,
আমার ছিল ঘুমিয়ে পড়ার মন,
নীল আকাশে জড়িয়ে নকশী কাঁথা

হেমন্তের শস্যহীন ন্যাড়া মাঠ অপেক্ষায় থাকবে | বৃষ্টি জলে ধুয়ে কবিতার বীজ বপন করবে নবীন কবির দল | মুক্তক ছন্দে ভরে উঠবে খামার |

অবসন্ন বেলায় ঈশ্বরীর বাগানে, গা এলিয়ে পড়ে ছিল কামরাঙা রোদ, পোড়ো বাড়িটার উঠোন থেকে, উঠে এসে উড়নচণ্ডী হাওয়া দূরান্বয়ী ছায়া দিয়ে

আমি বসে আছি নিস্তরঙ্গ কলরবকূলে, মালতীলতায় এবার ফুল আসেনি, হাঁড়িতে মা ভবানী, উনুনে পুড়ছে অস্তিত্বের ব্যাকুলতা
One Response
স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং চিকিৎসকের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োগে তুলে ধরেছেন লেখক, যা সত্যিই প্রশংসনীয়।