সহজপাঠ পাঠচক্র শুধুই একটা পাঠচক্র নয়—এটা একটা চলমান গল্প, যেখানে তুমি আমন্ত্রণপ্রাপ্ত চরিত্র।

নিতাই মন্ডলের বিয়েটা আজ বছর পাঁচেক হয়ে গেল।
জামাইষষ্ঠী বলে একটা ভালো-মন্দ গিলবার দিন আছে, এ কথা মনে রাখার থেকে ভুলে যাওয়াটা তার আত্মার জন্য বেশি শান্তির।
এ বিষয়ে হালকা রসিকতা করে বউকে হাস্যরসাত্মক মৌখিক দরখাস্ত করলেই
গিন্নি গম্ভীর হয়ে জবাব দেন—
“আমাদের ঘোষ বাড়িতে ওই সব হঠকারী কালচার নেই।”
জামাইষষ্ঠীর দিনটি অফিস অর্ধেক ছুটি থাকে। তাই ঐ দিনটি বিভিন্ন ভালো ভালো খাবারের স্মৃতিচারণায় কেটে যায় নিতাই-এর।
কিন্তু হঠাৎ মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি।
জামাইষষ্ঠীর তিন দিন আগে
শ্বশুরমশাই রাসবিহারী ঘোষের ফোন—
“কালকেই তোমরা দুজন অফিসে পাঁচ দিনের ছুটি নিয়ে চলে এসো।”
নিতাই “ঠিক আছে বাবা” বলার সাথে সাথেই
ফোনটি সমাপ্ত হলো।
সত্যিই রাসবিহারী বাবু বড্ড রাসভারি লোক।
সমস্ত ঘটনাটি জানার পর গিন্নি তির্যক কথা ছুড়ে দিলেন—
“এবার পাঁচ বছরের খাবার একসাথে খেয়ে প্রতিশোধ নেবে নাকি?”

 

“তোমার ধারণা ঠিক।”
নিরুত্তর নিতাই মনে মনে নিজের সাথেই রসিকতা করলেন।

 

যাই হোক, সেই মহেন্দ্রক্ষণ এলো।
জামাইষষ্ঠীর আগের দিন
মাটির হাঁড়িতে রসগোল্লা, কেজি তিনেক পাকা আম,
আর একটা কোল্ড ড্রিংকসের বোতল নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে হাজির। আজকালকার দিনে সত্যিই এত গুণী জামাই পাওয়া দুষ্কর।
আগত সবকিছু খাবারদাবার এক পাশে নামিয়ে সস্ত্রীক প্রণামটুকু সেরে নিলেন।
রাসবিহারী বাবু রাসভারি কণ্ঠ একটু নামিয়ে উত্তর দিলেন—
“বেশ বেশ, ভালো থাকো।
যাই হোক, তোমরা যখন এসেছ,
তোমাদেরকে জরুরি তলবের কারণটা বলি—
আজ আমার বিয়েটা ৩২ বছর হতে চলল, এই প্রথম জামাইষষ্ঠীর নিমন্ত্রণ পেলাম।
তাই ভাবছি, তোমার মা আর আমি এই বৃহৎ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে আসি।
তোমরা এই দু-তিন দিন না হয় এখানেই হাওয়া বদল করে যাও।”

 

গুরুগম্ভীর, কেউকেটা শ্বশুরমশাইয়ের এমন রসবোধ সম্পর্কে নিতাই-এর ধারণা ছিল না।
এত বড় দুর্দমনীয় শোক কাটিয়ে উঠতে কী জানি, এখনো হয়তো ২৭ বছর অপেক্ষা করতে হবে।

Facebook
Twitter
Email
Print

2 Responses

  1. জামাইষষ্ঠী” গল্পটি এক কথায় বললে—সহজ, সরস ও তীক্ষ্ণ রসবোধে ভরপুর। লেখক সাবলীল ভাষায় একচিলতে গৃহস্থালী স্মৃতিকে এমনভাবে মেলে ধরেছেন, যে পাঠকের মুখে অনায়াসে হাসি ফুটে ওঠে।

    নিতাইয়ের আত্মিক ক্লান্তি আর রাসবিহারী ঘোষের রাসভারি রসবোধ—এই দুই বিপরীত সুরের টানাপোড়েনই গল্পের মূল মজাটা তৈরি করেছে। বিশেষ করে শেষের মোচড়—যেখানে শ্বশুরমশাই নিজের জামাইষষ্ঠীর জন্য জামাইকে ডেকে আনেন—তা চমৎকারভাবে ‘উল্টে দেওয়া ঘরোয়া চেনা দৃশ্য’-এর স্বাদ দেয়।

    লেখার বড় শক্তি তার সংযত কৌতুক, সংলাপের স্বাভাবিকতা এবং অপ্রত্যাশিত কিন্তু আনন্দদায়ক সমাপ্তি। কোথাও অতিরিক্ত নাটকীয়তা নেই, অথচ একটা দারুণ আবহ তৈরি হয়।

    যা আরও ভালো হতে পারত:
    গল্পের শুরু একটু ধীর লয়ে এগোয়, কিছু জায়গায় বাক্য বিন্যাস আরও মসৃণ হতে পারত। তবে শেষে এসে হাস্যরস ও আবেগের ভারসাম্য পুরো গল্পটাকে প্রাণবন্ত করে তোলে।

    সারসংক্ষেপে:
    এ গল্পটি একটি প্রমাণ যে, ছোট ছোট পারিবারিক গল্পেও কত হাসি, ব্যঙ্গ, আর আত্মিক ছোঁয়া লুকিয়ে থাকে—যদি লেখকের কলমে সেই ধমক থাকে।

    ⭐ রেটিং: ৮.৫/১০
    (রসবোধ, বাস্তবতার রূপায়ণ এবং পরিণতির জন্য বাড়তি পয়েন্ট)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related article

কবিতা
সুমন সিংহমহাপাত্র

জাদুকরের মৃত্যু

আমার ছিল বাউল হওয়ার শখ,
আমার ছিল জাদু শেখার কথা,
আমার ছিল ঘুমিয়ে পড়ার মন,
নীল আকাশে জড়িয়ে নকশী কাঁথা

Read More »
কবিতা
সুকুমার কর

হেমন্তের দেশে

হেমন্তের শস্যহীন ন্যাড়া মাঠ অপেক্ষায় থাকবে | বৃষ্টি জলে ধুয়ে কবিতার বীজ বপন করবে নবীন কবির দল | মুক্তক ছন্দে ভরে উঠবে খামার |

Read More »
কবিতা
চিত্তরঞ্জন ভট্টাচার্য্য

করাঙ্গুলি রুদ্রাক্ষমালায়

অবসন্ন বেলায় ঈশ্বরীর বাগানে, গা এলিয়ে পড়ে ছিল কামরাঙা রোদ, পোড়ো বাড়িটার উঠোন থেকে, উঠে এসে উড়নচণ্ডী হাওয়া দূরান্বয়ী ছায়া দিয়ে

Read More »
কবিতা
চিত্তরঞ্জন ভট্টাচার্য্য

ঈশ্বরীর দুঃখ

আমি বসে আছি নিস্তরঙ্গ কলরবকূলে, মালতীলতায় এবার ফুল আসেনি, হাঁড়িতে মা ভবানী, উনুনে পুড়ছে অস্তিত্বের ব্যাকুলতা

Read More »