সহজপাঠ পাঠচক্র শুধুই একটা পাঠচক্র নয়—এটা একটা চলমান গল্প, যেখানে তুমি আমন্ত্রণপ্রাপ্ত চরিত্র।

এ আমার ছেলেবেলার গল্প।


দুই দিস্তা খাতা পেপার কভার দিয়ে সেলাই করে ওই এক খাতাতেই জীবনবিজ্ঞান, ভৌতবিজ্ঞান, বাংলা, ইতিহাস, অঙ্ক—সবই চালিয়ে নিতাম।
“ভিন্ন সাবজেক্টে ভিন্ন খাতা”—শিক্ষকদের এই দাবি আমি বহু মার খেয়েও মেনে নিইনি। এবং ওই খাতাতেই আমার হিজিবিজি ভাবনার দিনলিপি খোদাইয়ের কাজও চলত।


আমার ঠাকুমা খাতা শেষ হয়ে গেলে সেগুলো ফেরিওয়ালাকে বিক্রি করে কাপ-ডিস কিনতেন। ক্লাসের নোট লিখে রাখা আছে বলে নয়, মাঝে মাঝে সেখানেই দিনলিপি, কবিতা লিখতাম বলে প্রতিবাদ করেছিলাম, কিন্তু শেষ হওয়া খাতার যে আর কোনো মূল্য নেই—এ বিষয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিত আমার ঠাকুমা আর কোনো জ্ঞান নিতে রাজি ছিলেন না।


তাই এ বিষয়ে আমি পরবর্তীতে তেমন আর প্রতিবাদ করতাম না।
টিউশন টিচারদের যখন সবচেয়ে বড় চিন্তার ব্যাপার ছিল, কিভাবে সিলেবাস শেষ হবে—সেই সময় আমি শরৎচন্দ্র রচনাবলী শেষ করার গুরু দায়িত্ব তুলে নিয়েছিলাম।


এভাবে সময় তো বেশ চলে যাচ্ছিল, কিন্তু সময় সব সময় চলে যায় না—মাঝে মাঝে থমকে দাঁড়িয়েও যায়!


একবার আমার প্রতিবেশী পাড়াতুতো দাদা আমাকে একটি বিশেষ যন্ত্র দেখালেন, যাতে গান শোনা যায় বিনা ক্যাসেটে। এবং এও জানিয়ে দিলেন—সেটিকে আইপড বলে।
মাত্র দেড়শ টাকার বিনিময়ে তিনি সেটি আমাকে দিয়ে দিতে রাজি।
আমি টিফিন খাওয়া ছেড়ে দিলাম।
তিলে তিলে খুচরো টাকা জমাতে শুরু করলাম।


পাশের মুদিখানার দোকানে সেই খুচরো টাকা দিয়ে নোট সংগ্রহ করতাম।


এরকম ভাবেই উদ্যম নিয়ে সংগ্রহ বাড়াতে লাগলাম।


যতই লক্ষ্যবস্তুর কাছে আসছিলাম, ততই আমার হাসি চওড়া হচ্ছিল।
কিন্তু ব্যাপারটি যথেষ্ট গোপনে চালাতে হচ্ছিল, কারণ এরকম একটা ব্যাপার বাড়িতে জানানো খুবই জটিল।


পাঠ্যপুস্তক না পড়াতে বাবার কাছে মার খেতে হয় মাঝে মাঝেই।
স্কুল গেলেই সামান্য টিফিন খরচ জমানোর সুযোগ পাই—এই জন্য স্কুল কামাই একদমই করছিলাম না সে সময়।
এই বিষয়টি লেখাপড়ার প্রতি আমার আগ্রহ বেড়েছে বলেই বাবা ধরে নিয়েছিলেন।
অবশেষে একটি বিভীষিকাময় দিন আগমন হলো আমার জীবনে।


স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে শুনলাম আমার ঠাকুমা পুরোনো খাতাটি বিক্রয় করে চারটি নতুন কাপ কিনেছেন।


আমার তো মর্মাহত হয়ে ধপ করে বসে পড়লাম উঠানে—নিদারুণ শোকে অশ্রু আটকাতে চায় না।
এরকম মাইলস্টোন দুঃখ কমই পেয়েছি।


পড়াশোনার প্রতি এতটা আগ্রহী হতে বাবা আমাকে বোধহয় প্রথমবারই দেখেছিলেন। এবং ঠাকুমাকে বেশ জোরের সাথেই বলেছিলেন—
“এই কাজটা তুমি বড্ড খারাপ করো মা। পুরোনো খাতা বিক্রি করাটা তোমার একদমই ঠিক নয়।”


আমার ঠাকুমা বোধহয় জীবনে প্রথমবারই উপলব্ধি করেছিলেন—কাজটা তিনি ঠিক করেননি।
সে কান্না আমার থেমে গিয়েছিল ঠিকই। কিন্তু সেই ভয়াবহ শোক কাটিয়ে উঠতে আমার আরো কয়েক সপ্তাহ গিয়েছিল। কি করে আমি সবাইকে বলবো—আমি গোপনে আইপড কেনার জন্য ৫০ টাকার দুটি নোট সেই পুরোনো খাতাটির ভিতরেই রেখেছিলাম।

Facebook
Twitter
Email
Print

3 Responses

  1. গল্পটি পাঠকের হৃদয়ে এক অদ্ভুত স্নেহমাখা আলো ফেলতে শুরু করে। লেখক যেন নিঃশব্দে হাত ধরে আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যান এক চেনা-অচেনা শৈশবে, যেখানে বইপড়া, খাতা, টিফিন, ঠাকুমা, এবং গোপন স্বপ্ন—সবই এক ছায়ায় মিশে যায়।

    গল্পটি একাধারে নস্টালজিক, কোমল ও হৃদয়বিদারক। পুরনো খাতার পাতায় গোপন করে রাখা স্বপ্ন, আর ঠাকুমার নির্দোষ অথচ অজান্তে-কৃত ‘অপরাধ’—এই দ্বন্দ্ব এমন এক অনুভব জাগায়, যা খুব পরিচিত, খুব বাস্তব। পাঠকের চোখের কোণে হালকা এক জলঘন ছায়া ফেলেই লেখক জানান দেন—শৈশব কখনোই সরল থাকে না।

    যা ভালো লেগেছে:

    লেখার ভাষা সহজ, অথচ আবেগপূর্ণ।

    খুদে অথচ গভীর চরিত্রচিত্রণ (যেমন ঠাকুমা ও বাবার সংলাপ)।

    “পুরনো খাতার ভিতরে রাখা ৫০ টাকার দুটি নোট” – এই টুইস্টটি গল্পে এক অনন্য বেদনার ছোঁয়া এনে দেয়।

    গল্পের শেষে এসে যেভাবে একটি সাধারণ ঘটনার পেছনের আবেগ উন্মোচিত হয়, তা একদম প্রশংসনীয়।

    যা আরও উজ্জ্বল হতে পারত:

    গল্পের মাঝখানে কিছু জায়গায় ছন্দ একটু ধীর হয়ে পড়ে, যা ছোটখাটো সম্পাদনায় আরও ধারালো হতে পারত।

    আইপড কেনার ইচ্ছেটি গল্পের মূল আবেগ থেকে খানিকটা সরিয়ে দেয়, তবে সেটিই আবার শেষের চমকে এক মর্মান্তিক রূপ নেয়।

    সারসংক্ষেপে:
    এই গল্পটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শৈশব মানে শুধু দুষ্টুমি আর আনন্দ নয়, বরং গোপন স্বপ্ন, চুপচাপ লড়াই, আর অপূরণীয় কিছু না বলা কথার স্মারক। এটি এক নিঃশব্দ চিঠি আমাদের নিজের হারিয়ে যাওয়া বয়সের কাছে।

    ⭐ রেটিং: ৯/১০
    (নস্টালজিয়া, আবেগ আর সংবেদনশীল টুইস্টের জন্য বাড়তি নম্বর)

  2. গল্পটি সত্যিই মন ছুঁয়ে গেল।এরকম গল্প আমার মতো পাঠকের জন্য যেন আলাদীনের প্রদীপ। লেখক কে অসংখ্য ধন্যবাদ, আপনার লেখনশৈলীর ধারা দেখে আমি আপ্লূত ও অভিভূত। ভবিষ্যতে যেনো আরো এরকম গল্প পাই তার অনুরোধ রইল

  3. সত্যিই অসাধারণ মুগ্ধ হয়ে গেলাম গল্প পড়ে আরো এরকম গল্প শুনতে চাই সত্যি দারুন সুন্দর হয়েছে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related article

কবিতা
সুমন সিংহমহাপাত্র

জাদুকরের মৃত্যু

আমার ছিল বাউল হওয়ার শখ,
আমার ছিল জাদু শেখার কথা,
আমার ছিল ঘুমিয়ে পড়ার মন,
নীল আকাশে জড়িয়ে নকশী কাঁথা

Read More »
কবিতা
সুকুমার কর

হেমন্তের দেশে

হেমন্তের শস্যহীন ন্যাড়া মাঠ অপেক্ষায় থাকবে | বৃষ্টি জলে ধুয়ে কবিতার বীজ বপন করবে নবীন কবির দল | মুক্তক ছন্দে ভরে উঠবে খামার |

Read More »
কবিতা
চিত্তরঞ্জন ভট্টাচার্য্য

করাঙ্গুলি রুদ্রাক্ষমালায়

অবসন্ন বেলায় ঈশ্বরীর বাগানে, গা এলিয়ে পড়ে ছিল কামরাঙা রোদ, পোড়ো বাড়িটার উঠোন থেকে, উঠে এসে উড়নচণ্ডী হাওয়া দূরান্বয়ী ছায়া দিয়ে

Read More »
কবিতা
চিত্তরঞ্জন ভট্টাচার্য্য

ঈশ্বরীর দুঃখ

আমি বসে আছি নিস্তরঙ্গ কলরবকূলে, মালতীলতায় এবার ফুল আসেনি, হাঁড়িতে মা ভবানী, উনুনে পুড়ছে অস্তিত্বের ব্যাকুলতা

Read More »