
সম্পাদকীয় : জি. কে. চেস্টারটনকে জন্মদিনে শ্রদ্ধা
আজকের দিনে জন্মেছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের এক বর্ণময় চরিত্র—গিলবার্ট কিথ চেস্টারটন, যিনি ছিলেন একাধারে প্রাবন্ধিক, রম্যরচনাকার, ঔপন্যাসিক, কবি এবং ধারালো যুক্তিবিদ।
জন্ম: ৫ জুন ১৮৬৫
মৃত্যু: ১৮ এপ্রিল ১৯৪৮
৫ই জুন, ১৮৬৫ — হুগলি জেলার বানিপুরে জন্মগ্রহণ করেন এমন একজন মনীষী, যাঁর চিন্তা ও কর্ম আজও আমাদের শিক্ষার দর্শনে আলো ছড়ায়। সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় শুধু একজন শিক্ষাবিদ বা সাহিত্যিক ছিলেন না — তিনি ছিলেন ভারতীয় জাতিসত্তার জাগরণের এক নিঃশব্দ বিপ্লবী, যিনি গোড়ার দিকেই বুঝেছিলেন যে দেশের মুক্তির প্রথম ধাপ শিক্ষার স্বরাজ।
পজিটিভিজম ও আত্মিক অনুপ্রেরণা
সতীশচন্দ্রের শৈশবের অন্যতম প্রভাব ছিল তাঁর পিতা কৃষ্ণনাথ মুখোপাধ্যায়, যিনি কলকাতা হাইকোর্টে অনুবাদক হিসেবে কাজ করতেন এবং বিচারপতি দ্বারকানাথ মিত্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। দ্বারকানাথ ছিলেন অগাস্ত কঁতের ‘Religion of Humanity’-র অনুগামী, যার থেকে সতীশচন্দ্রও প্রভাবিত হন। এই পজিটিভিজম বা মানবতাবাদী চিন্তাধারাই পরবর্তীতে তাঁর জীবনদর্শনের মেরুদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়।
এ সময়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-ও কঁতের দর্শনের প্রবক্তা ছিলেন। সতীশচন্দ্রের আত্মিক ও দার্শনিক অনুসন্ধানের শুরু এখানেই।
এক আলোকিত ছাত্রজীবন ও চিন্তাবিদদের সাহচর্য
কলকাতার দক্ষিণ সুবর্ণ স্কুল থেকে শিক্ষা শুরু করে সতীশচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রেরণায় উদ্দীপ্ত হন। তাঁর সহপাঠী ও বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন অশ্বিনীকুমার দত্ত, শিবনাথ শাস্ত্রী, বিপিনচন্দ্র পাল, ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো ব্যক্তিত্ব।
তিনি নিজে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এম.এ. এবং বি.এল. পাশ করে ক্যালকাটা হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে নাম লেখান। পরে তিনি বহরমপুর কলেজে ইতিহাস ও অর্থনীতির অধ্যাপক হন। ১৮৯৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ভাগবত চতুষ্পাঠী, একটি বিকল্প উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান।
ডন সোসাইটি ও জাতীয় শিক্ষার স্বপ্ন
১৮৯৭ সালে তিনি সম্পাদনা শুরু করেন Dawn পত্রিকা, এবং ১৯০২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ডন সোসাইটি, যা হয়ে ওঠে জাতীয় শিক্ষানীতির কেন্দ্রবিন্দু। ডন সোসাইটির কার্যক্রম ছিল ছাত্রদের মধ্যে স্বদেশপ্রেম, নৈতিকতা, চিন্তার স্বাধীনতা এবং সামাজিক দায়িত্ব জাগ্রত করা। এখানে সিস্টার নিবেদিতা, বাঘা যতীন, রাজেন্দ্র প্রসাদ, রাধাকুমুদ মুখার্জি সহ বহু কৃতি মানুষের পদচারণা ঘটে।
১৮৯৯ সালে তিনি প্রস্তাব দেন একটি স্বতন্ত্র জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠনের, যা ১৯০৫-এর পর বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আরও জোরদার হয়।
শ্রীঅরবিন্দ ও বঙ্গীয় জাতীয় কলেজ
সতীশচন্দ্র ছিলেন শ্রীঅরবিন্দের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। ১৯০৬ সালে Subodh Mullick-এর সহায়তায় গঠিত হয় জাতীয় শিক্ষা পরিষদ এবং বঙ্গীয় জাতীয় কলেজ। শ্রীঅরবিন্দের অবসরের পর ১৯০৭ সালে সতীশচন্দ্রই হন কলেজের অধ্যক্ষ এবং বন্দে মাতরম পত্রিকার লেখক। এই সময়ে তিনি “শিক্ষার মূল লক্ষ্য আত্মজাগরণ” — এই দর্শন প্রতিষ্ঠা করেন।
আধ্যাত্মিক পথে অভিমুখ এবং গান্ধীজির সঙ্গে সম্পর্ক
১৮৯৩ সালে বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী-এর সান্নিধ্যে তিনি দীক্ষা নেন এবং তাঁর নির্দেশেই ১৯১৪ সালে বারাণসী চলে যান। সেখানেই তাঁর শেষ জীবন কেটেছে আধ্যাত্মিক সাধনায়। এখানেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় মহাত্মা গান্ধী-র। দুজনেই ছিলেন সত্যের সন্ধানী। গান্ধীজী এক সময় দীক্ষার জন্য তাঁর কাছে আসেন, কিন্তু সতীশচন্দ্র তাঁকে বলেন — “আপনার প্রয়োজন নেই, আপনি নিজেই সত্যপথে আছেন।”
সতীশচন্দ্র প্রতি মাসে গান্ধীজিকে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য অর্থ পাঠাতেন। তাঁদের মধ্যে গভীর পত্রালাপ চলত, যার শেষ চিঠি লেখেন তিনি ২৪ জানুয়ারি ১৯৪৭-এ। ১ ফেব্রুয়ারি গান্ধী তাতে উত্তরে লেখেন — “Your lovely letter”। ৩০ জানুয়ারি গান্ধী যখন “হে রাম” উচ্চারণ করে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তার কয়েক মাস পর ১৮ এপ্রিল ১৯৪৮-এ সতীশচন্দ্র-ও দেহত্যাগ করেন।
উপসংহার: এক নিঃশব্দ বিপ্লবীর শিক্ষা
সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের জীবন আমাদের শেখায় — শিক্ষা মানে কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয়, আত্মজ্ঞান, জাতীয়তা, সমাজসেবা ও মানবতাবাদ। তাঁর চিন্তা ও দর্শন আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি ছিলেন এক নিঃশব্দ বিপ্লবী, যিনি জাতিকে শিক্ষার মাধ্যমে জাগাতে চেয়েছিলেন। ৫ই জুনে তাঁর জন্মদিনে আমরা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি এক বিস্মৃত নায়ককে, যাঁর মতো মানুষের জন্যই আজও আমাদের মাটিতে আলো জ্বলে।
আজ যখন আমরা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নানা আলোচনা করি, তখন সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের চিন্তা আমাদের নতুন দিশা দেখাতে পারে। তাঁর জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলা যায় — তিনি ছিলেন এমন একজন পথিকৃৎ, যিনি কলম ও চিন্তার মাধ্যমে এক স্বাধীন ও আত্মনির্ভর শিক্ষার স্বপ্ন দেখেছিলেন। ৫ই জুন শুধু তাঁর জন্মদিন নয়, এটি হোক ভারতীয় চিন্তার মুক্তির প্রতীক।

আজকের দিনে জন্মেছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের এক বর্ণময় চরিত্র—গিলবার্ট কিথ চেস্টারটন, যিনি ছিলেন একাধারে প্রাবন্ধিক, রম্যরচনাকার, ঔপন্যাসিক, কবি এবং ধারালো যুক্তিবিদ।

আজকের এই সময়ে, যখন প্রশ্ন করা বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে, ভলতেয়ার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন—“স্বাধীন চিন্তাই সবচেয়ে বড় বিপ্লব।”

২০২৫ সালে ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’তে ভূষিত হয়েছেন ব্রাজিলের বেদান্ত প্রচারক আচার্য জোনাস মাসেত্তি। এই স্বীকৃতি শুধু একজন ব্যক্তির অর্জন নয়—এটি ভারতীয় দর্শনের আন্তর্জাতিক প্রসারের এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা সত্যেন্দ্রনাথ ছিলেন এক রুচিশীল ও বিদ্বান মানুষ। পশ্চিমী শিক্ষার প্রভাবে প্রতিপালন হলেও, তাঁর মনন ছিল গভীরভাবে দেশপ্রেমিক এবং সমাজ সচেতন।