আজ থেকে ২৪৬ বছর আগে, ১৭৭৮ সালের ৩০ মে, থেমে গিয়েছিল একটি কলম। কিন্তু যিনি সেই কলম ধরেছিলেন, তাঁর চিন্তা আজও জেগে আছে—প্রজ্বলিত আগুনের মতো। তিনি ফ্রঁসোয়া-মারি আরুয়ে, আমাদের পরিচিত নাম—ভলতেয়ার। যুক্তিবাদ, মুক্তচিন্তা, বাকস্বাধীনতা আর মানবতার অক্লান্ত যোদ্ধা ছিলেন তিনি। আজকের এই সময়ে, যখন প্রশ্ন করা বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে, ভলতেয়ার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন—“স্বাধীন চিন্তাই সবচেয়ে বড় বিপ্লব।”
বিদ্রোহী এক শিশুর থেকে বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক
১৬৯৪ সালে প্যারিসে জন্ম নেওয়া ভলতেয়ার ছোটবেলা থেকেই ছিলেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী এবং বিদ্রোহী স্বভাবের। একবার এক ধর্মগুরু তাঁকে বলেছিলেন, “তুমি জাহান্নামে যাবে।” উত্তরে ভলতেয়ার বলেন, “আপনি কি আমার জন্য আগেভাগেই জায়গা বুক করেছেন?” এই রসবোধ আর তীক্ষ্ণ প্রতিবাদী মন তাঁর সমগ্র জীবনের পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়।
২৩ বছর বয়সে ফ্রান্সের রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে কবিতা লেখাতে, তাঁকে বাস্টিল কারাগারে পাঠানো হয়। তবুও থামেননি—জেলখানায় থেকেও তিনি কলম চালিয়ে গেছেন প্রতিবাদের ভাষা নিয়ে।
ইংল্যান্ডে নির্বাসন ও মুক্তচিন্তার সূচনা
নির্বাসনে গিয়ে ইংল্যান্ডের গণতন্ত্র, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় সহিষ্ণুতা দেখে তিনি মুগ্ধ হন। এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে আরও বেশি করে যুক্তিবাদের দিকে ঠেলে দেয়। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন—যে সমাজে প্রশ্ন করা যায় না, সেখানে কখনোই মুক্তি আসতে পারে না।
“কাঁদিদ”—বিদ্রুপে মোড়ানো জীবনবোধ
ভলতেয়ারের অন্যতম বিখ্যাত রচনা Candide (কাঁদিদ) তাঁর তীব্র রসবোধ ও বাস্তববোধের চূড়ান্ত প্রকাশ। এই উপন্যাসে তিনি কল্পনাপ্রসূত আশাবাদিতার বিরুদ্ধে বিদ্রুপ করেছেন। মূল বার্তাটি ছিল স্পষ্ট—“সব তত্ত্ব বাদ দাও, নিজের বাগান চাষ করো।” অর্থাৎ, বড় বড় তত্ত্ব না ভেবে বাস্তব কাজের মাধ্যমে নিজের জীবন গড়ে তোলো।
বাকস্বাধীনতার অগ্রদূত
ভলতেয়ারের প্রতি সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা জানানো হয় তাঁর একটি মর্মস্পর্শী অবস্থানের জন্য—“আমি তোমার মতের সাথে একমত নই, তবুও তোমাকে সেটা বলার অধিকার রক্ষায় জীবন দিতেও রাজি আছি।” যদিও এটি সরাসরি তাঁর বলা নয়, তবুও এটি তাঁর ভাবনার প্রতিফলন। তিনি বিশ্বাস করতেন—প্রকৃত স্বাধীনতা মানে অন্যের মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করাও।
বর্তমান সময়ে ভলতেয়ার কেন গুরুত্বপূর্ণ
আজকের দুনিয়ায়, যেখানে সামাজিক মাধ্যমেও মতপ্রকাশে বাধা আসে, যেখানে শাসকের সমালোচনায় কারাবরণ হয়, যেখানে ধর্মের নামে হিংসা হয়, সেখানে ভলতেয়ারের শিক্ষাই আমাদের সত্যিকারের দিশারি। তিনি শিখিয়েছেন—যুক্তি, মানবতা ও সহিষ্ণুতা ছাড়া সমাজ এগোতে পারে না।
শেষ কথা
চার্চ প্রথমে তাঁকে সমাধিস্থ করতে অস্বীকার করেছিল। কিন্তু পরে ফ্রান্সের প্যানথিয়নে তাঁকে সমাহিত করা হয় এই শিরোনামে—“তিনি সহিষ্ণুতার জন্য লড়েছেন।” আজকের দিনে, যখন মানবতা ও চিন্তার স্বাধীনতা হুমকির মুখে, তখন ভলতেয়ারকে মনে রাখা শুধু প্রাসঙ্গিক নয়—প্রয়োজনীয়।
ভলতেয়ার নেই, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন, আদর্শ, আর প্রতিবাদের আগুন—আজও বেঁচে আছে। আমাদের শুধু দরকার, সেই আগুনটিকে আবার জ্বালানো।