সহজপাঠ পাঠচক্র শুধুই একটা পাঠচক্র নয়—এটা একটা চলমান গল্প, যেখানে তুমি আমন্ত্রণপ্রাপ্ত চরিত্র।

সম্পাদকীয়: রমেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী; বিজ্ঞানের সাহিত্যময় ভাষ্যকার

জন্ম: ২২শে আগস্ট ১৮৬৪ 
মৃত্যু: ৬ই জুন ১৯১৯

আজ, ৬ই জুন, আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি এক বিস্মৃতপ্রায় বাঙালি মনীষী—রমেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী (১৮৬৪–১৯১৯)। সাহিত্যের প্রাঙ্গণে তিনি ছিলেন এক অনন্য পথিকৃৎ, যিনি বিজ্ঞানের জটিল তত্ত্বকেও রূপ দিয়েছিলেন সহজ, সাহিত্যিক ভাষায়। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার যে বীজ তিনি বপন করেছিলেন, তা আজও আমাদের চিন্তাধারায় প্রভাব ফেলে।

জন্ম ও শিক্ষা
রমেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর জন্ম ১৮৬৪ সালের ২২শে আগস্ট, মুর্শিদাবাদের কান্দি শহরে। তিনি ছিলেন রামনাথ ত্রিবেদীর পুত্র এবং এক শিক্ষিত, সংস্কৃতিপ্রেমী পরিবেশে বড় হয়েছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি দর্শনে অনার্সসহ স্নাতক হন এবং পরে শিক্ষকতা ও গবেষণার জগতে প্রবেশ করেন।

সাহিত্যজগতে তাঁর ভূমিকা
রমেন্দ্রসুন্দর মূলত প্রবন্ধকার হিসেবে পরিচিত হলেও তাঁর লেখায় ছিল বহুমাত্রিকতা। তিনি বিজ্ঞানের কঠিন ও জটিল ধারণাকে সহজ ভাষায়, গল্পের আকারে, সাহিত্যরস সহকারে উপস্থাপন করতেন। তাঁর জনপ্রিয় গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে:

“প্রবাসী” পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত প্রবন্ধ

“বিজ্ঞানচর্চা” ও “সাহিত্য ও বিজ্ঞান”

“চিত্র ও চিন্তা” – যেখানে চিন্তাধারার সঙ্গে কল্পনার মিশ্রণ ঘটেছে

তিনি বিশ্বাস করতেন—জ্ঞান যদি মানুষের কাছে সহজ ও আকর্ষণীয়ভাবে না পৌঁছে, তবে তার সত্যিকার মূল্যায়ন হয় না। এই কারণেই তিনি সাহিত্যকে ব্যবহার করেছিলেন বিজ্ঞানের বাহক হিসেবে।

ভাবনার গভীরতা ও দর্শনচিন্তা
তিনি শুধু বিজ্ঞান বা সাহিত্যেই থেমে থাকেননি। তাঁর লেখায় সামাজিক প্রশ্ন, নৈতিকতা, এবং জীবনদর্শনের গভীর দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। একদিকে যেমন তিনি ইউরোপীয় বিজ্ঞানের মেধা গ্রহণ করেছিলেন, অন্যদিকে তেমনই ভারতীয় দার্শনিক ঐতিহ্যেরও মূল্যবোধ ধরে রেখেছিলেন।

মৃত্যু ও প্রাসঙ্গিকতা
রমেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর মৃত্যু ঘটে ১৯১৯ সালের ৬ই জুন, কলকাতায়। আজ, তাঁর প্রয়াণ দিবসে তাঁকে স্মরণ করা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা এবং সাধারণের কাছে তথ্য সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজন আগের চেয়ে অনেক বেশি।

উপসংহার
রমেন্দ্রসুন্দর ছিলেন এমন এক চিন্তাবিদ, যিনি যুক্তি ও কল্পনার এক অপূর্ব সেতুবন্ধন তৈরি করেছিলেন। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানকে সাহিত্যের মাধ্যমে জনপ্রিয় করে তোলার যে সাহসী ও সুসংস্কৃত প্রয়াস তিনি করেছিলেন, তা বাংলা চিন্তাচর্চার ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। আজকের দিনে তাঁকে নতুন করে পাঠ করা এবং তাঁর কাজগুলো তুলে ধরা আমাদের সাহিত্য ও সমাজ—উভয়েরই প্রয়োজনে রূপান্তরকামী।

রচনারীতি ও অবদান

রমেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী ছিলেন একজন বহুবিদ্যাবিশারদ যিনি বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞানের দর্শন সহ বিভিন্ন বিষয়ে লিখেছেন। তাঁর প্রথম প্রবন্ধগুলি ‘নবজীবন’ নামক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ-এর কার্যকারিতা এবং উন্নয়নে তাঁর অবদানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

বাংলায় রমেন্দ্রসুন্দরের খ্যাতি মূলত তাঁর জনপ্রিয় বিজ্ঞান প্রবন্ধগুলির জন্য। একজন জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক হিসাবে, রমেন্দ্রসুন্দরের লক্ষ্য ছিল “বিজ্ঞান (রমেন্দ্রসুন্দরের ক্ষেত্রে, আধুনিক পশ্চিমা বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু ও আবিষ্কার) এর আনন্দ, তৃপ্তি ও উল্লাস সবার সাথে ভাগ করে নেওয়া।” এটি কেবলমাত্র একটি দেশীয়, নমনীয় এবং বোধগম্য ভাষিক মাধ্যমের মধ্যে বিদেশী পদ ও বিষয়বস্তুগুলিকে মিশিয়ে সম্ভব হয়েছিল।

এভাবে, বৈজ্ঞানিক পরিভাষা তৈরি করার সময় রমেন্দ্রসুন্দর এমন শব্দ চয়ন করার দিকে খেয়াল রাখতেন যা শ্রুতিমধুর এবং সহজে উচ্চারণযোগ্য ছিল, তিনি পুরাণ, লোককাহিনী এবং স্থানীয় ঐতিহ্য থেকে উদাহরণ টেনে আনতেন… হাস্যরস দিয়ে তাঁর গদ্যকে মজবুত করতেন, মৃদু ব্যঙ্গ দিয়ে তাঁর মন্তব্যগুলি সাজাতেন এবং সবচেয়ে গুরুতর বিষয়গুলিও ঠোঁটে হাসি নিয়ে আলোচনা করতেন। এই রসিক, ধূর্ত, সংশয়ী, প্রফুল্ল এবং অত্যন্ত মানবিক ধারায় তিনি বিজ্ঞান, জ্ঞানতত্ত্ব এবং দর্শনকে একটি বাঙালি আড্ডার মধ্যে টেনে এনেছিলেন এবং তাদের একজন ভদ্রলোকের বসার ঘরের পালঙ্কের উপর বসিয়েছিলেন।”


 

গ্রন্থাবলী

  • প্রকৃতি: দর্শন সম্পর্কিত প্রবন্ধের সংকলন।
  • জিজ্ঞাসা: বিজ্ঞান সম্পর্কিত প্রবন্ধের সংকলন।
  • চরিত-কথা: বাংলা সাহিত্যের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের উপর লিখিত প্রবন্ধ ও বক্তৃতার সংকলন।
  • বিচিত্র প্রসঙ্গ
  • বাঙলা লক্ষ্মীর ব্রতকথা
  • বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস: (খণ্ড- আধুনিক যুগ, পৃষ্ঠা ১১১) ড. দেবেন্দ্রকুমার আচার্য রচিত।
Facebook
WhatsApp
Email
Print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়
সম্পাদক

সম্পাদকীয় : জি. কে. চেস্টারটনকে জন্মদিনে শ্রদ্ধা

আজকের দিনে জন্মেছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের এক বর্ণময় চরিত্র—গিলবার্ট কিথ চেস্টারটন, যিনি ছিলেন একাধারে প্রাবন্ধিক, রম্যরচনাকার, ঔপন্যাসিক, কবি এবং ধারালো যুক্তিবিদ।

Read More »
সম্পাদকীয়
সম্পাদক

সম্পাদকীয়: ভলতেয়ার—চিন্তার স্বাধীনতার এক অনন্ত বাতিঘর

আজকের এই সময়ে, যখন প্রশ্ন করা বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে, ভলতেয়ার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন—“স্বাধীন চিন্তাই সবচেয়ে বড় বিপ্লব।”

Read More »
সম্পাদকীয়
সম্পাদক

সম্পাদকীয়: আচার্য জোনাস মাসেত্তি — এক ব্রাজিলিয়ান বেদান্তাচার্যের ভারতীয় সম্মান

২০২৫ সালে ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’তে ভূষিত হয়েছেন ব্রাজিলের বেদান্ত প্রচারক আচার্য জোনাস মাসেত্তি। এই স্বীকৃতি শুধু একজন ব্যক্তির অর্জন নয়—এটি ভারতীয় দর্শনের আন্তর্জাতিক প্রসারের এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

Read More »
সম্পাদকীয়
সম্পাদক

সম্পাদকীয়: সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর—ভারতীয় নবজাগরণের এক প্রজ্ঞাবান অগ্রদূত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা সত্যেন্দ্রনাথ ছিলেন এক রুচিশীল ও বিদ্বান মানুষ। পশ্চিমী শিক্ষার প্রভাবে প্রতিপালন হলেও, তাঁর মনন ছিল গভীরভাবে দেশপ্রেমিক এবং সমাজ সচেতন।

Read More »