সহজপাঠ পাঠচক্র শুধুই একটা পাঠচক্র নয়—এটা একটা চলমান গল্প, যেখানে তুমি আমন্ত্রণপ্রাপ্ত চরিত্র।

একটি অটিজম স্পেকট্রাম এ থাকা কিশোরীর মাধ্যমিক পরীক্ষা ও ডিপ্রেশন: পঞ্চম পর্ব

অটিজম ও সেনসরি ইস্যুস


এই বিষয়ে কথা বলা আমার পক্ষে হয়তো একটু শক্ত। না আমি কোনো থেরাপিস্ট, না আমি মেডিকেল পার্সোনাল। কিন্তু আমি একজন মা হিসেবে এই প্রসঙ্গে কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা জানাতে চাই।


প্রথমত, সেনসরি বা ইন্দ্রিয় জনিত সমস্যা বলতে আমরা কি বুঝি? অটিজম এর জার্নি শুরু করার প্রথম দিকে আমি দেখতাম আমার মেয়ে কোথাও কোনো আঘাত পেলেও সেই জায়গার ত্বক খুঁটতে থাকে। আমরা ভাবতাম ও বুঝি যন্ত্রণা অনুভব করছে না। তখন কিন্তু আমরা সেনসরি ইস্যু বলে যে একটা বিষয় আছে তা জানতাম না। কিন্তু আস্তে আস্তে আমি বুঝতে পারলাম, আমরা যেভাবে আমাদের ইন্দ্রিয় ব্যাবহার করি, একটি অটিস্টিক শিশু সেভাবে করে না।


বোঝা গেল কি? চলুন একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করি। ধরুন আপনি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন, হঠাৎই মনসা পূজোর ভাসানের শোভাযাত্রার সামনে পড়ে গেলেন। গ্রামবাংলার মনসা ভাসান জানেন কি? কমকরে কুড়ি ত্রিশটা ডিজে বক্স বাজে একসাথে। এখন এর সামনে পড়লে আমার – আপনার কি হতে পারে? নিশ্চয়ই বুক ধড়ফড় করবে বা কানটা ঝাঁঝাঁ করবে। এটা আমার নিজেরই হয়। কিন্তু এটা একটা এক্সট্রিম সাউন্ড। সুতরাং এতে আমাদের কষ্ট লাগাটা স্বাভাবিক। কিন্তু ধরুন ঢাকের আওয়াজ বা বাজি( যেকোনো সেক্ষেত্রে আতসবাজি ও) কিংবা বাজ পড়ার শব্দ। এসব ক্ষেত্রে আমাদের কারোর কারোরও ভয় হয় বা বলা ভালো আমরা চমকে উঠি। কিন্তু শারীরিক ভাবে ভীষণ অস্বস্তি হয় কি? একটি অটিস্টিক শিশুর হয়। সে তখন কাঁদতে থাকে। সেখান থেকে পালাতে চায়। কোনোভাবেই সেখানে তাকে আর রাখা যায় না। তার মেল্টডাউন হয়। আসলে এই শিশুরা শব্দের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সংবেদী।


এতো গেলো শব্দের কথা। আমাদের অনেকেরই একটা অভ্যাস আছে। কোথাও কোনো ফুসকুড়ি বা নখ ভেঙে গেলে সেখানটা খোঁটা। অনেকেই দাঁত দিয়ে নখ খোঁটেন।আমরা হয়তো অনেকেই শচীন তেন্ডুলকারকে এরকম করতে দেখেছি। এখন একটি অটিস্টিক শিশু এটি করে চরম মাত্রায়। সে চামড়া খুঁটতে খুঁটতে রক্ত বার করে ফেলে। এখন প্রশ্ন হলো করে কেন? ঐ যে বললাম শিশুটির ইন্দ্রিয়গুলি অতিশয় সংবেদনশীল। সে ত্বকের কোনোরকম অসামঞ্জস্য সহ্য করতে পারে না।


তেমনই কোনো কোনো বিশেষ স্পর্শ ও এদের কাছে যন্ত্রণাদায়ক। আমি দেখেছি আমার মেয়ে ঝোপঝাড় এড়িয়ে চলে। একটা গাছের ডাল পথের পাশে থাকলে ও সেই পথ দিয়ে যায় না। তবে ওর ক্ষেত্রে দর্শন বা স্বাদ জনিত কোনো অসুবিধে নেই। এই সবকিছুই হলো সেনসরি ইস্যু। অটিস্টিক শিশুর অতি সংবেদনশীল ইন্দ্রিয় এদের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।


কিন্তু এটা জানা দরকার যে সব অটিস্টিক শিশুর সংবেদনশীলতা সমান নয়। কিছু কিছু শিশু যেমন অতি মাত্রায় সংবেদনশীল তেমনই কিছু শিশু একেবারেই সংবেদী নয়। এভাবে বিচার করেই অটিস্টিক শিশুদের দুটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। – হাইপারসেনসিটিভ ও হাইপোসেনসিটিভ। অতিসংবেদী শিশুরা শব্দ, গন্ধ এমনকি বিশেষ বিশেষ স্বাদেও সংবেদনশীলতা দেখায়। আমার মেয়ে চটচটে জিনিস খেতে চায় না। ও মেলাতে গিয়ে বুড়ির চুল বলে যে শোন পাপড়ি আমরা খাই, তা খেতে চায়না। আটা বা আঠালো কিছু হাতে লেগে গেলে অস্বস্তি বোধ করে। হাত ঝাঁকায়।


তেমনই হাইপোসেনসিটিভ শিশু আবার সেভাবে এই অনুভূতিগুলো বুঝতে পারে না।
এখন এইসব শিশুদের সেনসরি নীড দেখা যায়। এটা বোঝানো আমার মতো শুধুমাত্র একজন অভিভাবকের পক্ষে সহজ করে বোঝানো একেবারেই অসম্ভব। চেষ্টা করছি শুধু। আসলে অভিজ্ঞতা থেকে বলি আমরা যখন কোনো পেশাদারদের কাছে এইসব টার্মগুলো শুনি, তখন শুধুই শব্দগুলো সংগ্রহ করি মাত্র। কিন্তু খুব যে একটা বুঝতে পারি তা কিন্তু নয়। তাই একটু সহজে আমি যা বুঝি তা জানানোর একটা চেষ্টা করছি। ভুল বলে থাকলে সবিনয় মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি আগেই।


একটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা বোঝানোর চেষ্টা করছি। ধরুন আপনার খুব মন খারাপ। তখন আপনি কি করবেন? নিশ্চয়ই চেষ্টা করবেন আপনার পছন্দসই কিছু কাজ করে মনখারাপ কাটানোর। একটি অটিস্টিক শিশুর ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। শুধুমাত্র তার প্রকাশ আলাদা।তার যে মানসিক অস্থিরতা বা আবেগ বা আনন্দ – সবকিছুই সে প্রকাশ করে কিছু অঙ্গসঞ্চালনের মাধ্যমে। হাত দ্রুত নাড়ানো বা পা নাচানো বা অন্য কিছু। এমন অনেক কিছু সে করে যা আপনার চোখে ভীষণ অস্বাভাবিক। কিন্তু মনে রাখুন প্লিজ এগুলো তার নিজের মনের উত্তেজনা কমানোর উপায়।


এখন এইসব আচরণ কমানোর জন্য আমরা কি করতে পারি। কিছু নির্দিষ্ট ব্যায়াম বা কার্যক্রম আছে যা দিয়ে আমরা এই উত্তেজনা প্রশমিত করতে পারি। কিন্তু এটা সম্পূর্ণ পেশাদারী সহায়তায় করতে হবে। আমি আপনি কি করতে পারি। হাতে পায়ে গ্লিসারিন লাগিয়ে রাখতে পারি। নয়েজ ক্যানসেলিং হেডফোন ব্যাবহার করতে পারি। সারা শরীরে প্রেসার দিয়ে ম্যাসেজ করতে পারি। বা কিছু ব্যায়াম করাতে পারি। খেলাধূলা খুব ভালো একটি বাছাই। সবচেয়ে ভালো হলো সাঁতার। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত আমাদের এখানে এটি সম্ভব করা যায়নি। আমাদের ছোটোবেলাতে আমরা প্রচুর কাদা ঘাটতাম। পুতুল বানাতাম। বিভিন্ন আকার গড়তাম। এখন শিশুরা সেই সব করতে পাচ্ছে না। সেটা কিন্তু খুব ভালো সেনসরি খেলা ছিলো। আজ তাই তার বদলে ক্লে অ্যাকটিভিটির সাহায্য নিতে হচ্ছে।

 তথ্যঋণ :- গুগল

Facebook
Twitter
Email
Print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ওনার আরো কিছু লেখা

প্রবন্ধ
সুতপা সিনহাবাবু

একটি অটিজম স্পেকট্রাম এ থাকা কিশোরীর মাধ্যমিক পরীক্ষা ও ডিপ্রেশন: প্রথম পর্ব

প্রথমেই বলি অটিজম সম্পর্কে সচেতনতা একটি ফোঁটাও আমাদের সমাজে তৈরি হয়নি। বিশেষ শিশুর বাবা- মা ছাড়া আর কেউ এতটুকুও কোনোভাবেই সচেতন নয়।

Read More »
প্রবন্ধ
সুতপা সিনহাবাবু

একটি অটিজম স্পেকট্রাম এ থাকা কিশোরীর মাধ্যমিক পরীক্ষা ও ডিপ্রেশন: দ্বিতীয় পর্ব

সমাজে বদল যদি আসেও তা হয়তো আমার সন্তান ভোগ করতে পারবে না। ওর তো জীবনের একটা অধ্যায় শেষ হয়ে গেলো। আস্তে আস্তে হয়তো পড়াশোনাটাই শেষ হয়ে যাবে।

Read More »
প্রবন্ধ
সুতপা সিনহাবাবু

একটি অটিজম স্পেকট্রাম এ থাকা কিশোরীর মাধ্যমিক পরীক্ষা ও ডিপ্রেশন: তৃতীয় পর্ব

স্যাভান্ট কোয়ালিটি কিন্তু সব অটিস্টিক শিশুর মধ্যে দেখা যায় না। আবার এমনও নয় যে স্যাভান্ট শিশুদের প্রতিবন্ধকতা খুব কম। তা কিন্তু একেবারেই নয়।

Read More »
প্রবন্ধ
সুতপা সিনহাবাবু

একটি অটিজম স্পেকট্রাম এ থাকা কিশোরীর মাধ্যমিক পরীক্ষা ও ডিপ্রেশন: চতুর্থ পর্ব

অটিজম একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। এবং আগেই বলেছি এখানে প্রতিটি শিশুই আলাদা। তাদের সমস্যা ও সমাধান এক নয়।

Read More »