সহজপাঠ পাঠচক্র শুধুই একটা পাঠচক্র নয়—এটা একটা চলমান গল্প, যেখানে তুমি আমন্ত্রণপ্রাপ্ত চরিত্র।

একটি অটিজম স্পেকট্রাম এ থাকা কিশোরীর মাধ্যমিক পরীক্ষা ও ডিপ্রেশন: দ্বিতীয় পর্ব

সমাজে বদল যদি আসেও তা হয়তো আমার সন্তান ভোগ করতে পারবে না। ওর তো জীবনের একটা অধ্যায় শেষ হয়ে গেলো। আস্তে আস্তে হয়তো পড়াশোনাটাই শেষ হয়ে যাবে। হয়তো ওর গান নিয়ে দেখা স্বপ্নটাও অধরাই থেকে যাবে। কিন্তু তাও আমরা চেষ্টা করে যাবো। কারণ আমি এটা দেখেছি ওর সংস্পর্শে আসা মানুষজনের মধ্যে বেশ কয়েকজন ওর সাপোর্ট সিস্টেম হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাদের কারোরই কিন্তু বিশেষ শিশু নেই। তাই আশা রাখি আমি। হয়তো একদিন আমাদের এই দেবশিশুরা সমাজে যোগ্য স্থান পাবে।

আর একটা কথা বলার আছে মূল প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে। মানছি প্রতিটি বাচ্চা এইধরনের পরীক্ষার আগে টেনশড হয়। কিন্তু সেই টেনশন হাতে প্রশ্ন পেলেই কেটেও যায়। আর একটি বিশেষ শিশুর টেনশন এক নয়। তার একটা দূর্বিষহ চাপ হয়…. যন্ত্রণা হতে থাকে। সে ভাবতে থাকে এখানে সে সম্পূর্ণ অসহায়। ওর হাতে চেনা স্পর্শ পায় না সে। ওর মাথায় সেই হাতটা নেই। যেকোনো গানের অনুষ্ঠানেও যে হাতটা ওর সাপোর্ট সিস্টেম। তখন ও নিজেকে দিশেহারা অনুভব করে। ওর মনে হয় ও জেলখানায় বন্দী। ও তখনই এই চাপটার থেকে পালাতে চায়। রেগে গিয়ে বিদ্রোহ করে। এবং অনেকের কাছে হয়তো শুনেও ফেলে যে ও পাগল। তখন ওর আরও বেশি কষ্ট হয়। কারণ ও তো বোঝে। প্রকাশ করে না হয়তো। কিন্তু আমাদের থেকে অনেক বেশি সংবেদনশীল ও।তাই যন্ত্রণা বাড়তেই থাকে। তাই অন্য কোনো বাচ্চার টেনশন আর ওর বা ওদের টেনশন এক নয়। অন্য বাচ্চারা পরীক্ষা শেষে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো উত্তাল আনন্দে ভেসেছে, সেখানে ও একমুখ কষ্ট নিয়ে বেরিয়ে এসেছে।

এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক্। আসলে আমরা যাঁরা বিশেষ শিশুর বাবা- মা, তাঁরা একটু ঝগড়ুটে বলতে পারেন। বাঁকুড়ার একটা ভাষা আছে – অসনা। মানে একটু কম সহ্য করি আমরা। কিন্তু পাহাড় প্রমাণ ধৈর্য ধরে আমরা আজ এই জায়গায় পৌঁছেছি। আমরা জানি আমাদের বাচ্চার জন্য শুধু আমরাই আছি। তাই মেনে নিতে পারিনা, আমাদের লড়াই করেই আদায় করতে হয়।

তবে এটা খুব সত্যি যে কাউকে দোষারোপ করা উচিত নয়। আপনার যদি বিশেষ শিশু না থাকে তাহলে আমাদের অসহায়তা আপনারা বুঝবেন না। তখন কিন্তু আপনাদের জ্ঞানগর্ভ কথাও আমাদের ভালো লাগবে না। তাছাড়া আপনাদের অটিজম বা অন্যান্য সমস্যার সাথে সেভাবে পরিচয় নেই। তাই কিছুটা জানানো প্রয়োজন আছে বৈকি। এই সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনেই এই পোস্ট করা।

অটিজম আমার জীবনের সাথে একাকার, তাই অটিজম এর কথাই বলবো।

অটিজম কি?

অটিজম একটি স্নায়বিক বিকাশজনিত সমস্যা। এবং এটি একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যা। গুগল থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী :-

1. প্রায় 100 শিশুর মধ্যে 1 জনের অটিজম আছে।
2. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে 36 জনের মধ্যে 1 শিশুকে অটিজম প্রভাবিত করে।
3. মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের 4.2 গুণ বেশি অটিজম ধরা পড়ে।
4. 2000 সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ASD এর প্রকোপ 312% বৃদ্ধি পেয়েছে।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতে প্রায় ১৮ মিলিয়ন মানুষ অটিজমে আক্রান্ত। এটি বিশ্বের বৃহত্তম অটিস্টিক জনসংখ্যার মধ্যে একটি।

ভারতে অটিজমের বিষয়ে আরও কিছু তথ্য:
অটিজমের আনুমানিক প্রাদুর্ভাব ৬৮ জন শিশুর মধ্যে ১ জন।

এবার এর কারণ সম্পর্কে যদি বলি তাহলে এর কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো আবিষ্কৃত নয়। সম্ভবত আজকের এই দ্রুত চলা সমাজব্যবস্থাই এর একটা পরোক্ষ কারণ হতে পারে।

তাহলে ভাবুন অবস্থাটা। হ্যাঁ, এটা বলাই যায় যে অটিজম বা অন্যান্য সমস্যা এতো বেশি পরিমাণে বাড়ছে যে আগামীতে প্রতিটি বাড়িতে অটিজম হলেও অবাক হওয়ার নয়।

এবার বলি প্রতিটি অটিস্টিক শিশু কি একই লক্ষ্মণ যুক্ত? না,তা কিন্তু একেবারেই নয়। অটিজম একটি স্পেকট্রাম অর্থাৎ বর্ণালী। বর্ণালী যেমন পৃথক তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সাতটি আলাদা আলাদা আলোর সমাহার, তেমনই এক একজন অটিস্টিক শিশু এক একরকম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। তাদের আচরণ আলাদা, সক্ষমতাও আলাদা। কিন্তু প্রত্যেকটি বিশেষ শিশু খুবই সভ্য ও মানবিক গুণসম্পন্ন। ওরা অনেক কিছুই পারে না, তাই শুধু উজাড় করে ভালোবাসতে জানে। এটা ওদের সবচেয়ে বড়ো সক্ষমতা। এবং এটাই ওদের দূর্বলতাও। কারণ এইভাবে ওরা কারোর কারোর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সেই কারণেই জীবনের প্রতিটি অজানা মুহূর্তে ওরা একটা ভালোবাসার আশ্রয় খোঁজে। ওরা চায় ওদের মাথায় কারোর হাত থাক্। সেটা চাইতে গিয়ে অজান্তেই হয়তো কারোর বিদ্বেষের কারণ ও হয়ে যায়।

আর একটি বিশেষ সমস্যা হলো মেল্টডাউন। হ্যাঁ, প্রতিটি অটিস্টিক শিশুরই মেল্টডাউন হয়। মাত্রাতিরিক্ত চাপে ওরা রেগে যায়, কাঁদে বা হাত- পা ছোঁড়ে। আরও কিছু কিছু সমস্যা এদের হয় মেল্টডাউন চলাকালীন। সেটাই বাইরের জগতের কাছে পাগলামি। কিন্তু তখন তাকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করতে হয়। আরও কিছু টেকনিক আছে। যা ক্ষেত্রবিশেষে নিজেদেরকেই উদ্ভাবন করতে হয়। কিন্তু মেল্টডাউনের মতো সেম সমস্যা আমাদের অনেক স্বাভাবিক বাচ্চারাও করে। কিন্তু তাদেরকে শুধু রাগী বলা হয়। পাগল বলা হয় না। তফাৎ শুধু এখানেই।

দ্বিতীয়ত, এদের অনেকরই অতিমাত্রায় সংবেদনশীলতা বা সংবেদনহীনতা দেখা যায়। এরা বিশেষ কোনো পোশাকেও অস্বস্তি অনুভব করে। ত্বকের খসখসে ভাব এদের কাছে চরম অস্বস্তিকর। কখনো কখনো সেখানের চামড়া ছিঁড়ে ফেলে। এবং এতে ওদের কষ্ট হয় না তা কিন্তু নয়। বরং বেশি কষ্ট হয়।

অনেক শিশুই আবহাওয়া জনিত বা অবস্থান জনিত পরিবর্তন মেনে নিতে পারেনা। সেটাও তাদের কষ্টের কারণ। অনেককেই কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হলে আগের থেকে বোঝাতে হয়। আমার মেয়ের ক্ষেত্রে অবশ্য এটি প্রযোজ্য নয়।

আবার এই শিশুদের আরেকটি সমস্যা ইকোলেলিয়া- একই কথা বা সুর বারবার রিপিট করা। বিশেষ কিছু শব্দ ওদের মনকে ট্রিগার করে। তখন কিছুদিন ওরা সেইসব শব্দই বারবার বলে। একই প্রশ্ন বারবার করে।

আবারও এদের মধ্যে বিশেষ কিছু অ্যাসোসিয়েটেড সমস্যা দেখা যায়। যেমন আমার মেয়ের ডিসক্যালকুলিয়া ও ডিসগ্রাফিয়া আছে।

এতো কিছু সমস্যা সত্ত্বেও আমাদের এই শিশুগুলির কারো কারোর মধ্যে বিশেষ কিছু প্রতিভা দেখা যায়। কয়েকজনকে আপনারা হয়তো ফেসবুকে পাবেন। বিনায়ক রুকু অসম্ভব সুন্দর ছবি আঁকে ও কবিতা লেখে। আরত্রিকের ইংরেজিতে লেখা কবিতা অসাধারণ বললেও কম বলা হয়। শ্রেয়স অসম্ভব সুন্দর আবৃত্তি করে। অনমিত দারুণ গান গায় আর ওর শ্রুতিনাটকের তো কোনও তুলনাই হয় না। এরা স্যাভান্ট পর্যায়ভুক্ত। তবে প্রতিটি বাচ্চাই কিন্তু অসাধারণ। কারণ তারা প্রত্যেকেই অসম্ভব ভদ্র ও স্নেহময়। আমার মেয়ে যেভাবে তার প্রিয় মানুষদের ডাকে তা কোনো সাধারণ বাচ্চার কাছে আশাই করা যায় না। এরা নিষ্পাপ শিশু। প্রত্যেকেই এক একটি দেবদূত। তাই এরা কথা বলে বোঝাতে না পারলেও অপর দিকের মানুষের চোখের ভাষা খুব ভালো বোঝে।

বলতে বলতে প্রধান লক্ষণটিই বলতে ভুলে গেছলাম। অটিজম মানে আত্মমগ্নতা। তাই এরা নিজেদের মধ্যে থাকতে চায়। সামাজিক ভাবে মেলামেশা এরা করতে চায় না। তাই জোর করে বাইরের থেকে বিভিন্ন উপায়ে মোটিভেট করে এদের সমাজের মূল স্রোতে আনতে হয়।

( To be continued)

Facebook
Twitter
Email
Print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ওনার আরো কিছু লেখা

প্রবন্ধ
সুতপা সিনহাবাবু

একটি অটিজম স্পেকট্রাম এ থাকা কিশোরীর মাধ্যমিক পরীক্ষা ও ডিপ্রেশন: প্রথম পর্ব

প্রথমেই বলি অটিজম সম্পর্কে সচেতনতা একটি ফোঁটাও আমাদের সমাজে তৈরি হয়নি। বিশেষ শিশুর বাবা- মা ছাড়া আর কেউ এতটুকুও কোনোভাবেই সচেতন নয়।

Read More »
প্রবন্ধ
সুতপা সিনহাবাবু

একটি অটিজম স্পেকট্রাম এ থাকা কিশোরীর মাধ্যমিক পরীক্ষা ও ডিপ্রেশন: দ্বিতীয় পর্ব

সমাজে বদল যদি আসেও তা হয়তো আমার সন্তান ভোগ করতে পারবে না। ওর তো জীবনের একটা অধ্যায় শেষ হয়ে গেলো। আস্তে আস্তে হয়তো পড়াশোনাটাই শেষ হয়ে যাবে।

Read More »
প্রবন্ধ
সুতপা সিনহাবাবু

একটি অটিজম স্পেকট্রাম এ থাকা কিশোরীর মাধ্যমিক পরীক্ষা ও ডিপ্রেশন: তৃতীয় পর্ব

স্যাভান্ট কোয়ালিটি কিন্তু সব অটিস্টিক শিশুর মধ্যে দেখা যায় না। আবার এমনও নয় যে স্যাভান্ট শিশুদের প্রতিবন্ধকতা খুব কম। তা কিন্তু একেবারেই নয়।

Read More »
প্রবন্ধ
সুতপা সিনহাবাবু

একটি অটিজম স্পেকট্রাম এ থাকা কিশোরীর মাধ্যমিক পরীক্ষা ও ডিপ্রেশন: চতুর্থ পর্ব

অটিজম একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। এবং আগেই বলেছি এখানে প্রতিটি শিশুই আলাদা। তাদের সমস্যা ও সমাধান এক নয়।

Read More »