
আবর্ত
পাতাল থেকে উঠে আসছে, অন্ধকারের নারকীয় আবর্ত। আমার ঘরে এখন মৃতপ্রায় সকাল, অনিচ্ছুক সংলাপে লিখে যাচ্ছে দগ্ধ তরুর আলেখ্য।
আগন্তুক পণ্ডিত বন্ধুটি আমার বারান্দায় বিকেলে এসে
নানাকথা বলছিলেন। তখন ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছিল।
চায়ে চুমুক দিতে দিতে তিনি বৃষ্টি এবং বন্যার কথা বলতে বলতে স্হানীয় সমাচার ও চাষ আবাদের কথা শেষ করে চলে গেলেন কালিদাসে। তারপরই রুষ্ট ভঙ্গিতে বলে বসলেন –তোমরা আর তোমাদের বন্ধুরা
কবিতার নামে যা লিখছো, তা সব অপাঠ্য এবং অবোধ্য।
বললাম–তুমি ঐ সব পড়?
পড়ি বলেই তো বলছি।পড়ি কিন্তু মাথায় কিছুই ঢোকে না।
–যাক , আর পড়ো না। তোমার কাছে ছাইপাঁশ হলে কী হবে, কবিতাই আমাদের চাষ আবাদ।
বন্ধুটির মুখে পণ্ডিতবর্গীয় বিদ্রূপের হাসি।
বৃষ্টি তখন ক্ষান্ত। তিনি আমাকে কালিদাস পড়ার
উপদেশ দিয়ে বিহ্বল মুহূর্ত সৃষ্টি করে চলে গেলেন।
তিনি চলে যাবার পর আমি ভাবতে বসলাম।
এখনকার কবিতা কিছুই বুঝি না–এরকম শিথিল
অসতর্ক দ্রুত মন্তব্য আচার্যসদৃশ কোনো কোনো পণ্ডিতের। পণ্ডিত হলেই যে তাঁকে কবিতার ব্যাকরণকুটিল ব্যাখ্যা দিতে হবে,সনাক্ত সনাক্তকরণের জ্যামিতিক রায় দিতে হবে–এমন কোনো নৈতিক দায়
তাঁর স্ব-অভিপ্রেত হলেও কবিতার মৌলিক ঐতিহ্য
তা অস্বীকার করবে।
কবিতা মানুষের আদিম শিল্প এবং নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠ অভিধায় অভিষিক্ত। ভাবনার তরীতে ভাষার তীরে
মানুষের উত্তরণের সময় থেকেই কবিতার পথ চলা শুরু। আভাসে ইঙ্গিতে ব্যঞ্জনায় সাংকেতিকতায়
মানুষের মনের দরজা খুলে দিয়েছে কবিতা। দেশকালে
সার্বজনীন আবেদনে কবিতা মানুষকে এনে দিয়েছে সহমর্মিতা আর সাহচর্যের আঙিনায়।
কবিতার ছোট্ট দু একটি কথা অজস্র কথার কলতান হয়ে পাঠকের কানে অনুরণিত হয়। একটি রম্য জগৎ
খুঁজে পান পাঠক, — যেখানে তাঁর প্রাণের আরাম,
মনের শান্তি। কবিতার মধ্যে আত্মদর্শনের সঙ্গে সঙ্গে মানবিক সমাচারের বৃহত্তর একটি পরিধি পাঠকের মনে অন্তরঙ্গ হয়ে ওঠে।
কবিতাকে যাঁরা ব্রাত্য করেন,তাঁরা ভুলে যান কবিতা বুঝতে গেলে অনুভূতি এবং চর্চায় অভিজ্ঞতার মুদ্রা সঞ্চয় করতে হয়। চিন্তাচেতনা,পঠন এবং অনুধ্যানে
মন দিতে হয়।
কবিতার অসম্মান সভ্যতার অপমান। ।

পাতাল থেকে উঠে আসছে, অন্ধকারের নারকীয় আবর্ত। আমার ঘরে এখন মৃতপ্রায় সকাল, অনিচ্ছুক সংলাপে লিখে যাচ্ছে দগ্ধ তরুর আলেখ্য।

পায়ে পায়ে পথ চলা, তোমার সঙ্গে কথা বলা, ফুরোয় না ফুরোয় না একেবারেই । চলো যাই নীপবনে, আপনমনে প্রত্নলিপির আবক্ষস্নান

একরাশ ধুলোর ঘূর্ণি ঘুরপাক দিয়ে, তছনছ করে দিচ্ছে ঘর সংসারের প্রাত্যহিক ভাষা, ভেঙে দিচ্ছে সম্ভ্রমের ভালোবাসা, আর দৈনন্দিন নিরাপত্তা।