সহজপাঠ পাঠচক্র শুধুই একটা পাঠচক্র নয়—এটা একটা চলমান গল্প, যেখানে তুমি আমন্ত্রণপ্রাপ্ত চরিত্র।
ফিকে লাল শাড়ি।সবুজ পাড়।
এলানো কেশে কৌশলকুন্তলা।
বিদ্যাবতী। পড়াশোনার বাইরে মন ছিল না।
আমাদের সহপাঠিনী। আত্রেয়ী।
আমরা নাম দিয়েছিলাম জবাকুসুম।
শুনে কৌতুকের হাসি হেসেছিল।
ধনী ব্যবসায়ীর আদুরে কন্যা।
তার বিবাহ হলো এক এক তরুণ ব্যবসায়ীর সঙ্গে।
তার বিবাহে আমাদের কয়েক জন বন্ধুর নিমন্ত্রণ ছিল।
আমরা যুক্তি করে উপহার দিয়েছিলাম
“বনলতা সেন,” এবং “ঘরে বাইরে “আর “দৃষ্টিপাত “।
তারপর যে যার জীবন নিয়ে ব্যস্ত। বন্ধুরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে এখানে ওখানে।
কেটেছে বেলা দিন গুনে গুনে।
কিছুকাল আগে নিজের কাজে যেতে হয়েছিল কলকাতা। শ্যামবাজারের মোড়ে সন্ধ্যায় দাঁড়িয়েছিলাম
বাসের অপেক্ষায়। জবাকুসুমকে দেখলাম অনেকদিন পর। সেও এসে দাঁড়ালো বাসস্ট্যান্ডের ছাউনিতে।
বিষণ্ণ উদাস চেহারায় মালিন্য। তবু চিনে নিতে ভুল হয় নি। তারও না। মৃদু হেসে পারস্পরিক কুশল জিজ্ঞাসা।
জানা গেল তার বিবাহ সুখের হয়নি। শ্বশুর ঘরে অর্থ ছিল। ছিল না পাঠচর্চা আর সম্ভ্রান্ত রুচি। দু বছরের মাথায় ছাড়াছাড়ি।
আমার বাস আসতেই যখন এগিয়ে যাচ্ছি,
তখন জবাকুসুম মৃদু কণ্ঠে বললো–আমার একটা ছেলে বা মেয়ে থাকলে পৃথিবীটা উল্টে দিতাম।
কথাটা আমাকে কেমন যেন একটা ঘোরের ভেতর ফেলে দিল।
ঘরে ফিরে আসার পর আমি কিছুতেই কথাটা ফেলে দিতে পারছিলাম না।
জবাকুসুমের ছবি আঁকি মনে মনে।
তার দুঃখবোধক শব্দগুলি তার সঙ্গে সঙ্গেই থাকে।
তারা গল্প বলে কখনও বা ছবি আঁকে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে জবাকুসুম।
প্রতিবিম্বে চোখ পড়লেই করুণ হাসি ছলকে পড়ে ঠোঁটের কোণায়। তারপর সেটা ভেঙে যায়।
সেই ভাঙা হাসিকে সে শোনায় তার ভ্রমণপথের কথা।
তারপর সে চুপ করে দাঁড়ায় জানালার ধারে।
আকাশ দেখে,দেখে লোক চলাচল, নিজেকে খুঁজে বেড়ায় পৃথিবীর পাঠশালায়।
জবাকুসুম বড় একা।
সন্ধ্যা নামলেই সে নিঃসঙ্গ বারান্দায় মনে মনে ঘুরে বেড়ায় দূরে জলের ধারে মাঠের আলপথে,
কাঁকরবিছানো গাঁয়ের রাস্তার পাশে গৃহস্থের সংসারে।
জবাকুসুম এখনও দাঁড়িয়ে আছে শ্যামবাজারের মোড়ে
বাসের অপেক্ষায়।
দাঁড়িয়ে থাক।
লোক চলাচলের দিকে মন নেই
তার চোখ পড়ে আছে দূরের একটা প্রসূতিসদনের দিকে।।
Facebook
WhatsApp
Email
Print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ওনার আরো কিছু লেখা

কবিতা
চিত্তরঞ্জন ভট্টাচার্য্য

আবর্ত

পাতাল থেকে উঠে আসছে, অন্ধকারের নারকীয় আবর্ত। আমার ঘরে এখন মৃতপ্রায় সকাল, অনিচ্ছুক সংলাপে লিখে যাচ্ছে দগ্ধ তরুর আলেখ্য।

Read More »
কবিতা
চিত্তরঞ্জন ভট্টাচার্য্য

আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে

পায়ে পায়ে পথ চলা, তোমার সঙ্গে কথা বলা, ফুরোয় না ফুরোয় না একেবারেই । চলো যাই নীপবনে, আপনমনে প্রত্নলিপির আবক্ষস্নান

Read More »
কবিতা
চিত্তরঞ্জন ভট্টাচার্য্য

বিভ্রান্তির কাল

ঘুম থেকে উঠে দেখি, আকাশটা নেই, চিলগুলো উড়ে গেছে, চিলেকোঠাতেই

Read More »
কবিতা
চিত্তরঞ্জন ভট্টাচার্য্য

চলো, ফিরে যাই

একরাশ ধুলোর ঘূর্ণি ঘুরপাক দিয়ে, তছনছ করে দিচ্ছে ঘর সংসারের প্রাত্যহিক ভাষা, ভেঙে দিচ্ছে সম্ভ্রমের ভালোবাসা, আর দৈনন্দিন নিরাপত্তা।

Read More »