
একটি অটিজম স্পেকট্রাম এ থাকা কিশোরীর মাধ্যমিক পরীক্ষা ও ডিপ্রেশন: প্রথম পর্ব
প্রথমেই বলি অটিজম সম্পর্কে সচেতনতা একটি ফোঁটাও আমাদের সমাজে তৈরি হয়নি। বিশেষ শিশুর বাবা- মা ছাড়া আর কেউ এতটুকুও কোনোভাবেই সচেতন নয়।
অটিজম ও বয়ঃসন্ধি
যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চলেছি আমি, তা নিয়ে অনেক বিদগ্ধ অগ্রজ অনেক কথা বলেছেন। হয়তো আমার বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ আমার থেকে অনেক বেশি জানেনও। কিন্তু আমি যা কিছু একান্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি তার নিরিখে এই লেখাগুলি লিখছি।
অটিজম একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। এবং আগেই বলেছি এখানে প্রতিটি শিশুই আলাদা। তাদের সমস্যা ও সমাধান এক নয়। তবুও অটিজম স্পেকট্রাম এ থাকা শিশুদের প্রতিবন্ধকতার দিক দিয়ে বিচার করে মোটামুটি তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। মাইল্ড, মডারেট ও সিভিয়ার। এর মধ্যবর্তীও কিছু শিশু থাকে। যেমন মাইল্ড ও মডারেটের মাঝামাঝি। এইসব শিশুদের প্রতিবন্ধকতা কিন্তু কোনো অংশেই কম নয়।
মানসিক দিক দিয়ে বিচার করলে একটি অটিস্টিক শিশুর মানসিক বয়স বেশ কিছুটা কম হয়। কিন্তু শারীরিক গঠন বয়সোচিত হয়।হরমোন ক্ষরণও শরীর নিয়ম মেনে ঘটায়। এর ফলে কিছু পরিবর্তন এই শিশুদের মধ্যেও দেখা যায়।
এবার আমি সামগ্রিক দিকে না তাকিয়ে আমার মেয়েটিকে দেখবো। প্রথম বয়ঃসন্ধিজনিত প্রকাশ ওর দেখেছিলাম গতবছর পূজোর সময়। ও যখন ক্লাস এইটে পড়তো তখন কিন্তু বয়ঃসন্ধিজনিত কোনো ব্যপার ওর মধ্যে ছিলো না। তখন ও ছিলো খুব বাধ্য। যা বলতাম সেটাই করতো। কিন্তু ওর যখন ক্লাস নাইন, তখন ওর মধ্যে একটা আশ্চর্য পরিবর্তন দেখলাম। দেখলাম ও দিনদিন জেদি হয়ে উঠছে। কিছু ক্ষেত্রে অসম্ভব একটা রিজিডিটি দেখা দিচ্ছে। আবার বকাবকি করলে কেঁদে ফেলছে। ও অভিমান করছে। আরও পাঁচটা কিশোরীর মতো ও বলছে যে ওকে কেউ ভালোবাসে না। বকলে বলছে ও অপমানিত ফীল করছে। এবং রোমান্টিক মুভি দেখা পছন্দ করছে। আরও বিশেষ ভাবে কিছু কিছু ছেলে কেমন পোশাক পরে সেটাও বলছে।
এগুলো কিন্তু একটাও খারাপ লক্ষণ নয়। কিন্তু যেটা কষ্টের তা হলো ও সব কথা বলতে পারছে না। তখনই ও খুব রেগে যাচ্ছে। কখনো কখনো নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। ও কখনো কখনো গুমরে গুমরে কাঁদছে। কোনো কাজে মন নেই। মনঃসংযোগ ছিলো ওর একটা প্রধান শক্তি। কিন্তু সেটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি ও অনেক কিছু বলতে চাইছে কিন্তু পারছে না। এখন এটা তো সত্যি আমাদের এই শিশুদের সহানুভূতি হয়তো লাখে একজন করবে। কিন্তু এদের কাছের একজন হিসেবে কোটিতেও একজনও ভাববে না।
হয়তো এই কৈশোরগুলির ও আকাঙ্খা আরও পাঁচটা কিশোর – কিশোরীর মতো। কিন্তু তা তো ওরা বোঝাতে পারছে না। এখানেই মা হিসেবে আমি অসহায় অনুভব করি। ওর যন্ত্রণা আমি ভাগ করে নিতে অক্ষম।
কিন্তু জানেন তো, এই শিশুগুলিও কিন্তু আরও পাঁচটা আপনাদের দেখা কিশোর কিশোরীর মতো বয়ঃসন্ধির এই ঝড়-ঝঞ্ঝার সময়ে একটা সহানুভূতির আশ্রয় খোঁজে। তারাও তাদের নরম অনুভূতিগুলোকে বাঁচিয়ে রাখে। প্রসঙ্গে বলি, আমি যেহেতু পেশাগত দিক দিয়ে প্রতিদিন এইসব বয়ঃসন্ধির বাচ্চাদের সাথে অনেকটা সময় কাটাই, তাই আমি জানি তারা কিরকম। কেউ কেউ ভীষণ অশান্ত। আমাদের শিশুরাও হয়তো ব্যতিক্রমী নয়। আসলে প্রথমে আমরা যেটা অনেক সময়ই ভূলে যাই যে মোটের উপর বিশেষ শিশুরাও কিন্তু এক একটি শিশুই। তাদের সেভাবেই বিচার করা উচিত।
এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনার উল্লেখ করি। গত রবিবার আমার মেয়ের তিনটি বন্ধু আমাদের বাড়িতে এসেছিলো। তারা সবাই খুব মেধাবী এবং বিশেষ শিশু নয়। কিন্তু তারা আমার মেয়েকে খুব ভালোবাসে। ওরা ওকে রোজ বলে ডাকে। ওদের সাথে আরও একটি মিষ্টি মেয়ে এসেছিলো যার সাথে কিন্তু আমার মেয়ে পরিচিত নয়। সে জানে না অটিজম সম্পর্কে। জিজ্ঞেস করছিলো রোজের সমস্যা সম্পর্কে। আমি কিভাবে ওকে বোঝাবো বুঝতে পারছিলাম না। তখন ওর বন্ধুরা হাল ধরলো। ওরা বললো, ” জানিস তো, আমরা মানুষের ভালো ও খারাপ উভয় দিক দেখতে পাই। কখনো কখনো মানুষের নিন্দা করি, সমালোচনা করি। রোজ কখনো কারোর খারাপ দিক দেখতে পায় না। ও সবসময় সবাইকে ভালো দ্যাখে। সবাইকে আপন করে নিতে চায়। এটাই ওর সমস্যা “। আমি এতো সুন্দর করে সত্যি অটিজমকে ব্যাখ্যা করতে পারতাম না। এটাই চরম সত্যি। একটি বিশেষ শিশু সত্যি দেবদূত।
কিন্তু তবুও এই সময় একটি বিশেষ শিশু কয়েকটি বিশেষ সমস্যার সমস্যার সম্মুখীন হয়।
প্রথমত, শরীরের বিশেষ পরিবর্তন মেনে নিতে পারেনা সবসময়। এবং একটা উদ্বেগ দেখা যায়। যার ফলস্বরূপ একটা অবসাদ ও ভীতি দেখা যায়।
দ্বিতীয়ত, শিশুটি কাউকে সেই উদ্বেগ বোঝাতে পারে না। সেখান থেকেই হয়তো তৈরি হয় রাগ, জেদ ও অভিমান।
এখন এই সমস্যা আমি মোকাবিলা করি ওকে ভালোবেসে। শুধু এই আশ্বাস সবসময় দিই যে আমি ওর পাশে আছি। যেকোনো উদ্বেগ বুঝতে পারলেই ওকে একটু একটু করে প্রশ্ন করে জানার চেষ্টা করি। যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিফলে যায়।প্রচুর আদর করি। একটা সময় এমন হয়েছিল যে ওকে উদ্বেগ কমানোর জন্য ওষুধ দিতে হয়েছে। এখন অবশ্য অনেক কমেছে।
( To be continued)

প্রথমেই বলি অটিজম সম্পর্কে সচেতনতা একটি ফোঁটাও আমাদের সমাজে তৈরি হয়নি। বিশেষ শিশুর বাবা- মা ছাড়া আর কেউ এতটুকুও কোনোভাবেই সচেতন নয়।

সমাজে বদল যদি আসেও তা হয়তো আমার সন্তান ভোগ করতে পারবে না। ওর তো জীবনের একটা অধ্যায় শেষ হয়ে গেলো। আস্তে আস্তে হয়তো পড়াশোনাটাই শেষ হয়ে যাবে।

স্যাভান্ট কোয়ালিটি কিন্তু সব অটিস্টিক শিশুর মধ্যে দেখা যায় না। আবার এমনও নয় যে স্যাভান্ট শিশুদের প্রতিবন্ধকতা খুব কম। তা কিন্তু একেবারেই নয়।

অটিজম একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। এবং আগেই বলেছি এখানে প্রতিটি শিশুই আলাদা। তাদের সমস্যা ও সমাধান এক নয়।