
একটি অটিজম স্পেকট্রাম এ থাকা কিশোরীর মাধ্যমিক পরীক্ষা ও ডিপ্রেশন: প্রথম পর্ব
প্রথমেই বলি অটিজম সম্পর্কে সচেতনতা একটি ফোঁটাও আমাদের সমাজে তৈরি হয়নি। বিশেষ শিশুর বাবা- মা ছাড়া আর কেউ এতটুকুও কোনোভাবেই সচেতন নয়।
স্যাভান্ট কোয়ালিটি কিন্তু সব অটিস্টিক শিশুর মধ্যে দেখা যায় না। আবার এমনও নয় যে স্যাভান্ট শিশুদের প্রতিবন্ধকতা খুব কম। তা কিন্তু একেবারেই নয়। অটিস্টিক শিশু মাত্রই শারীরিক, আচরণগত ও মানসিক কিছু সমস্যা থাকে। তাদের সেগুলি অতিক্রম করার ক্ষেত্রে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। আমরা যারা বিশেষ শিশুর অভিভাবক, তারা শুধু বাইরের থেকে সাহায্য করি। আসল লড়াই কিন্তু তাকেই লড়তে হয়।
একটু ভাবুন। একটি সাধারণ বাচ্চা যেখানে পরিবেশ থেকে ও পরিবার থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সবকিছু শিখে নেয়, সেখানে একটি বিশেষ শিশু কিন্তু তা পারে না। ভাবুন একটু। ধরা যাক্, আপনি একটা গভীর গর্তে পড়ে গেছেন। যেখানে আপনার চারদিকে পাথরের দেওয়াল। মাথার উপরেও দেয়াল। আপনার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। আপনি ভীষণ চেষ্টা করছেন। কিন্তু আপনি অসহায়। তখন আপনাকে বাঁচানোর উপায় কি? ওই পাথরের দেওয়াল ভেঙে ফেলা। একটি অটিস্টিক শিশুও নিজের চারপাশে ওরকমই পাথরের দেওয়াল অনুভব করে। তাই বাইরের পরিবেশ থেকে সে কিছুই গ্রহণ করে না। তখন তাকে শেখানোর জন্য একটু একটু করে ভাঙার চেষ্টা করতে হয়।সেগুলো হলো থেরাপি। বিভিন্ন রকম থেরাপি আছে। যেমন কথা বলানোর জন্য স্পীচ থেরাপি, সামগ্রিক জীবন যাপনের জন্য অকুপেশনাল থেরাপি, আচরণ থেরাপি।
একটি অটিস্টিক শিশু সাধারণত অন্য কারোর চোখের দিকে তাকায় না। এবং এক জায়গায় বসে থাকতেও চায় না। তাই সাধারণত প্রথম টাস্ক আমাদের এটাই হয়ে থাকে। তাকে বসানো ও চেষ্টা করা যাতে সে চোখের দিকে তাকায়। এবার আমার মেয়ের যখন অটিজম ধরা পড়ে তখন এতো ইন্টারনেট ব্যবহার ছিলো না। প্রকৃতপক্ষে আমরা জানতামই না অটিজম সম্পর্কে। নিমহ্যান্স যখন বলেছিলো আমার মেয়ে অটিস্টিক ফীচারযুক্ত, আমরা দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলাম। মনে হয়েছিলো তিনজনেই শেষ হয়ে যাই। সেই সময়ের কথা ভাবলে আজও বুকটা কেঁপে ওঠে।
যাইহোক তারপর যখন মানতে পারলাম আমার মেয়ে অটিস্টিক ও এই ফীচার নিয়েই ওকে সারাজীবন চলতে হবে, তখন নতুন করে লড়াই করা শুরু করলাম। একটি বিশেষ শিশুর বাবা-মা আসলে একজন আবিষ্কারক, উদ্ভাবক। প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন টেকনিক আবিষ্কার করতে হয়। প্রথমেই তাদের মেনে নিতে হয় যে তার শিশুটি একটি বিশেষ শিশু এবং তার চলার পথ সম্পূর্ণ আলাদা। সেটা মেনে নেওয়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রথম প্রশ্ন আমাদের মধ্যে আসে কেন আমার মেয়ে বা ছেলে এমন হলো? তখনই আমরা গুটিয়ে যাই। যখন অবস্থাটা বুঝতে পারি তখন খুব দিশেহারা অনুভব করি। কারণ আমরা জানি না কার কাছে যাবো। এরপর অবশ্যই আসে খরচের কথা। তাও অনেকেরই নাগালের বাইরে। তাই একরকম বলা যায় শিশুটি অনেক ক্ষেত্রেই অবহেলিত হয়ে পড়ে। পরিবারের ও সবাই তাকে যে খুব ভালো ভাবে মেনে নেয় তাও কিন্তু সবসময় দেখা যায় না।
যাইহোক এবার ওই যে বলছিলাম একটি অটিস্টিক শিশুর বসা ও চোখের দিকে তাকানোটাই একটা চ্যালেঞ্জ, তাই তার জন্য বিশেষ চেয়ার এর ব্যবস্থা করতে হয়। বলা উচিত খাঁচা। সেখানে তাকে আটকে রেখে বসানো অনুশীলন করাতে হয়। আমি ওকে কোলে বসিয়ে আমার চোখের দিকে তাকাতে বাধ্য করাতাম। তাতে বেশি কাজ হতো। এবং একটা বন্ডিং ও সেখান থেকে তৈরি হয়েছিলো। তারপর ওকে বিভিন্ন রকম কার্ড তৈরি করে শেখাতে হয়। পরিবারের লোকজনও ছবি দেখেই চেনানো হয়। এখন বিভিন্ন বিষয়ের ফ্ল্যাশকার্ড পাওয়া যায়। আমি ওসব পাইনি। আমরা সমস্ত মেটিরিয়াল তৈরি করেছিলাম। হাতের ব্যালান্স আনানোর জন্য চিমটে দিয়ে কুঁচফল, মুসুর ডাল ইত্যাদি ব্যবহার করতে হয়েছে। আমরা যারা গ্রামে থাকি তারা অনেক রকম সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। কিন্তু তা সত্ত্বেও কিছু কিছু মানুষ কাজ করছেন। তপন ঘোষ স্যার এর নাম এক্ষেত্রে করতেই হবে। এবং স্বপন রুদ্র স্যার। এই দুজন আমার মেয়ের জন্য ভগবান।
প্রকৃতপক্ষে আমাদের মতো যাদের বাড়িতে বিশেষ শিশু আছে তাদের প্রতিটি মুহূর্তে ভাবতে হয় নতুন নতুন টেকনিক। আমার শ্বাশুড়িমা ওকে শিখিয়েছেন খেতে। টয়লেট ট্রেনিং ও সহজ ছিলো না। এই প্রতিটি কাজ একটি স্বাভাবিক শিশু শেখে নিজে নিজে। আর একটি বিশেষ শিশুকে শেখাতে হয়। এবং তা একদিন – দুদিনে হয় না। হয়তো একটা সামান্য কাজ শেখাতে মাসের পর মাস চলে যায়। অসম্ভব ধৈর্য ধরে একটি একটি অংশে কাজটি বিচ্ছিন্ন করে শেখাতে হয়। এটি একটি বাড়ি তৈরির মতো। একটি একটি ইঁট গেঁথে যেমন এক একটা দেওয়াল তৈরি হয়, তেমনই একটা কাজকে বিভিন্ন সহজ অংশে ভেঙে ফেলতে হয়। এক একটা টার্গেট ঠিক করে নিতে হয়। তারপর সেই অনুযায়ী প্ল্যান ঠিক করে নিতে হয়।
( To be continued)

প্রথমেই বলি অটিজম সম্পর্কে সচেতনতা একটি ফোঁটাও আমাদের সমাজে তৈরি হয়নি। বিশেষ শিশুর বাবা- মা ছাড়া আর কেউ এতটুকুও কোনোভাবেই সচেতন নয়।

সমাজে বদল যদি আসেও তা হয়তো আমার সন্তান ভোগ করতে পারবে না। ওর তো জীবনের একটা অধ্যায় শেষ হয়ে গেলো। আস্তে আস্তে হয়তো পড়াশোনাটাই শেষ হয়ে যাবে।

স্যাভান্ট কোয়ালিটি কিন্তু সব অটিস্টিক শিশুর মধ্যে দেখা যায় না। আবার এমনও নয় যে স্যাভান্ট শিশুদের প্রতিবন্ধকতা খুব কম। তা কিন্তু একেবারেই নয়।

অটিজম একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। এবং আগেই বলেছি এখানে প্রতিটি শিশুই আলাদা। তাদের সমস্যা ও সমাধান এক নয়।